রাজধানীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বৃদ্ধি

Aug 18, 2026 - 18:08
 0  11
রাজধানীতে অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট  বৃদ্ধি

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। অথচ সরকার অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এসকল অবৈধ স্থাপনার কারণে অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ অপচয়, পরিবেশ দূষণ ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, দেশে ব্যাটারিচালিত ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা আনুমানিক ৬০ লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ। এসব যান চার্জ দিতে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপরও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের পাশাপাশি রাজধানীতে ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে। মিরপুর বিভাগে রয়েছে ৩ হাজার ৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি গ্যারেজ। ওয়ারী বিভাগে ৩ হাজার ৫১৬টি, গুলশানে ২ হাজার ৬৪৩টি, উত্তরা বিভাগে ১ হাজার ৩০৫টি এবং মতিঝিল বিভাগে ১ হাজার ৩৯০টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে।

এসব চার্জিং পয়েন্টের অনেকগুলো গড়ে উঠেছে খালি জায়গা, টিনশেড ঘর কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে। কোথাও কোথাও অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগের মাধ্যমে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ফলে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, ই-থ্রি-হুইলারের বিদ্যুৎ ব্যবহার দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশের সমান, যা দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়লেও এর ব্যবস্থাপনা এখনো নিয়মের মধ্যে আনা যায়নি। সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার পাশাপাশি ব্যাটারি পরিবেশ দূষণ করছে এবং অবৈধ চার্জিংয়ের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং বৈধ চার্জিং স্টেশন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যায় এসব যান নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।

মধ্যরাতেও কমছে না বিদ্যুতের চাহিদা

ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাপক চার্জিংয়ের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত রাত ১২টার পর পিক আওয়ার শেষ হলে বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যাশিত হারে চাহিদা কমছে না।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের মতে, রাত ১২টার পরও বিদ্যুতের চাহিদা না কমার পেছনে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ একটি বড় কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসাব তৈরির কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক এলাকায় রাতের বেলায় অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদার স্বাভাবিক সময়সূচিও বদলে যাচ্ছে।

সড়কেও বাড়ছে ঝুঁকি

শুধু বিদ্যুৎ নয়, ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে। মূল সড়কে উঠে আসা, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, হঠাৎ ইউটার্ন নেওয়া এবং ধীরগতিতে চলাচলের কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের মান এবং ফিটনেস নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে এসব যানকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট রুট ও লেনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকটি রিকশা জব্দ বা ডাম্পিং করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অবৈধ আমদানিকারক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী, অবৈধ বডি নির্মাতা ও বিদ্যুৎ চোর চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

আসছে নতুন ব্যবস্থাপনা

ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনায় ই-রিকশার নকশা, চলাচলের এলাকা, নিবন্ধন ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকার ই-রিকশাগুলোকে ডিএমপির আটটি জোনে পৃথক রঙ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের মাধ্যমে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধ, লাইসেন্স ছাড়া ই-রিকশা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি ই-রিকশায় জিপিএস সংযোজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এক জোনের ই-রিকশা যাতে অন্য জোনে যেতে না পারে, সেজন্য জিও-ফেন্সিং ব্যবস্থাও চালুর কথা বলা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ই-রিকশার নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীনভাবে যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরির পরিবর্তে নির্দিষ্ট কারখানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, কর্মসংস্থান ও স্বল্প খরচের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলেও ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এখন সড়ক, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ—তিন ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, বৈধ চার্জিং ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে এ খাতকে দ্রুত একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি।




What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

বাংলাদেশ ভিশন: বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সরকার, উন্নয়ন, নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় রূপান্তর সম্পর্কে বাংলা ভাষার সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য, গবেষণানির্ভর এবং প্রভাবশালী জ্ঞানভান্ডার হওয়া; যা নাগরিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। মিশন: বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি, শাসনব্যবস্থা, জননীতি, জাতীয় উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প এবং সমসাময়িক জাতীয় ইস্যুসমূহকে তথ্য-যাচাই, গবেষণা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্রেক্ষাপটসমৃদ্ধ সাংবাদিকতার মাধ্যমে উপস্থাপন করা; যাতে নাগরিকেরা শুধু "কি ঘটেছে" নয়, বরং "কেন ঘটেছে", "এর প্রভাব কী" এবং "এর ভবিষ্যৎ তাৎপর্য কী"—তা বুঝতে পারেন।