হার্ভার্ডের গবেষণায় জেনেটিক কোড বদলের নতুন পথ
প্রকৃতির নিয়মে জীবন্ত কোষ সাধারণত ২০টি প্রাকৃতিক অ্যামিনো অ্যাসিড ব্যবহার করে প্রোটিন তৈরি করে। এই দীর্ঘদিনের সীমা অতিক্রম করে নতুন ধরনের প্রোটিন তৈরির পথ দেখিয়েছেন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও ওয়াইস ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা। Nature এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় তারা AGENTEX নামে একটি স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে জীবন্ত কোষের জিনোম পরিবর্তন না করেই পরীক্ষাগারে নতুন জেনেটিক কোড তৈরি ও পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
জীবনের প্রচলিত কোড কী?
প্রকৃতিতে থাকা অধিকাংশ জীবের জেনেটিক কোডে ৬৪টি কোডন রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রাকৃতিক অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য কোডন ব্যবহৃত হয়। একই অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য একাধিক কোডন থাকায় সবগুলো কোডনের আলাদা কাজ নেই।
ষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল tRNA-এর শেষ প্রান্ত। সাধারণ tRNA-এর ৩′ প্রান্তে CCA সিকোয়েন্স থাকে। গবেষকেরা দেখতে পান, কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন করা রাইবোজোম বিকল্প প্রান্তযুক্ত tRNA-ও গ্রহণ করতে পারে।
এ জন্য তারা রাইবোজোমের বড় সাবইউনিটে G2251C এবং G2553C নামের দুটি মিউটেশন ব্যবহার করেন। এর ফলে নির্দিষ্ট ধরনের non-CCA tRNA রাইবোজোমে কাজ করার সুযোগ পায়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন ধরনের tRNA ব্যবহার করা গেলে প্রচলিত জেনেটিক কোডের বাইরে গিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
তৈরি হলো AGENTEX
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই গবেষকেরা তৈরি করেন AGENTEX—Automated Genetic tRNA Expansion।
এটি একটি স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, যা নতুন tRNA তৈরি, পরীক্ষা এবং বিভিন্ন জেনেটিক কোডের কার্যকারিতা যাচাই করতে পারে। গবেষণায় tRNA, রাইবোজোম, mRNA এবং অন্যান্য উপাদানকে ব্যবহার করে cell-free translation system-এ প্রোটিন তৈরির পরীক্ষা চালানো হয়। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি জীবন্ত কোষের ভেতরে ঘটানো হয়নি।
এ পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো, নতুন জেনেটিক কোড পরীক্ষা করতে সরাসরি কোনো জীবন্ত কোষের জিনোম ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়ে না।
২০টির জায়গায় ৩৪ অ্যামিনো অ্যাসিডের সম্ভাবনা
গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলগুলোর একটি হলো ৩৪টি কোডন ব্যবহার করে ৩৪ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য একটি সংকুচিত জেনেটিক কোড ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা।
গবেষকেরা প্রচলিত ৬৪ কোডনের ব্যবস্থাকে সংকুচিত করে ২০টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য ২০টি কোডন ব্যবহারের মডেল তৈরি করেন। এতে আরও ১৪টি কোডন নতুন বা non-standard building block ব্যবহারের জন্য খালি রাখা সম্ভব হয়।
পরীক্ষায় গবেষকেরা non-standard amino acid-কে প্রোটিনে যুক্ত করতে সক্ষম হন এবং একই translation system-এ প্রচলিত ও নতুন জেনেটিক কোডের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করেন।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রোটিনের গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে অ্যামিনো অ্যাসিডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকৃতিতে ব্যবহৃত ২০টির বাইরে আরও building block দিয়ে প্রোটিন তৈরির সুযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের প্রোটিন, জৈব উপাদান ও biopolymer তৈরির সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে নতুন প্রোটিনভিত্তিক ওষুধ, উপাদান এবং অন্যান্য জৈবপ্রযুক্তি পণ্য তৈরির গবেষণাকে দ্রুত করতে পারে। তবে এসব ব্যবহার এখনো মূলত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। এই গবেষণায় সরাসরি কোনো নতুন ক্যানসার চিকিৎসা বা রোগ নিরাময়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জীবন্ত কোষের বাইরে পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো biocontainment। নতুন জেনেটিক কোড ও উপাদানগুলোকে জীবন্ত কোষের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত cell-free পরিবেশে পরীক্ষা করা হয়েছে।
ফলে গবেষকেরা জীবন্ত কোষের জিনোমে বড় ধরনের পরিবর্তন না করেই নতুন জেনেটিক কোডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে পারেন। হার্ভার্ডের গবেষকেরা এটিকে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদভাবে নতুন প্রোটিন তৈরির একটি পথ হিসেবে দেখছেন।
সামনে আরও বড় সম্ভাবনা
গবেষকেরা মনে করছেন, AGENTEX-এর মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে প্রকৃতিতে না থাকা জেনেটিক কোড নিয়ে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা চালানোর সুযোগ তৈরি করবে। এমনকি ভবিষ্যতে জীবন্ত কোষের ভেতরেও নতুন জেনেটিক কোড ব্যবহারের গবেষণায় এটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন।
What's Your Reaction?