অ্যান্টিবায়োটিক কমানোর নতুন উপায়, চট্টগ্রামে গবেষণা
অ্যান্টিবায়োটিক যত বেশি দিন, ততই বাড়ে প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি। এই ব্যবহার কমানোর পথ খুঁজতে চট্টগ্রামে চালানো এক গবেষণায় মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফল। ৫৩২ সেপসিস রোগীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, PCT পরীক্ষা কাজে লাগিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।
৫৩২ রোগী নিয়ে গবেষণা
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস বা সম্ভাব্য সেপসিসে আক্রান্ত ৫৩২ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের দুটি সমান দলে ভাগ করা হয়।
একটি দলের রোগীদের রক্তে প্রতিদিন প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। অন্য দলের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ক্লিনিক্যাল তথ্যের ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন মেডিসিন ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.ফিল গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দীন হাসান চৌধুরী।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় কমেছে
গবেষণায় দেখা যায়, PCT পরীক্ষা করা রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে গড়ে ৪ দশমিক ৭ দিন। অন্যদিকে প্রচলিত চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই সময় ছিল ৯ দিন।
মোট অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হিসাবেও পার্থক্য ছিল। PCT দলে তা ছিল গড়ে ৭ দশমিক ২ দিন, আর নিয়ন্ত্রণ দলে ১৩ দশমিক ২ দিন। দৈনিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরিমাণও PCT দলে কম ছিল।
২৮ দিনের পর্যবেক্ষণে PCT দলে মৃত্যুহার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, আর নিয়ন্ত্রণ দলে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। পুনঃসংক্রমণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিকের সময় কমানো হলেও বাড়তি ঝুঁকির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কীভাবে কাজ করে PCT?
প্রোক্যালসিটোনিন বা PCT হলো একটি বায়োমার্কার, যার মাত্রা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের সময় সাধারণত বেড়ে যায়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা কমতে থাকে।
গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরুর ৭২ ঘণ্টা পর থেকে PCT-এর মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে এলে কিংবা আগের সর্বোচ্চ মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার বিষয়টি চিকিৎসকদের বিবেচনা করতে বলা হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?
প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাধারণত সংক্রমণের অবস্থা বুঝতে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা, CRPসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব পরীক্ষার ফল সবসময় ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের সঠিক চিত্র দিতে পারে না। PCT-এর পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার সিদ্ধান্তে চিকিৎসকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান।
খরচ ও সীমাবদ্ধতা
গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক বাবদ খরচ PCT দলে গড়ে ৪৫ দশমিক ৮ ডলার থেকে ৩৭ দশমিক ১ ডলারে নেমে আসে। তবে PCT পরীক্ষার খরচ যোগ করলে মোট সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা বেড়ে যায়। গড়ে চারটি PCT পরীক্ষা করতে প্রায় ১৬ ডলার খরচ হয়েছে।
গবেষকদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা ভবিষ্যতে যে পরিমাণ ব্যয়বহুল হতে পারে, তার তুলনায় এই অতিরিক্ত খরচ বিবেচনাযোগ্য। তবে বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালে এখনো PCT পরীক্ষার সুযোগ নেই এবং পরীক্ষাটির খরচও তুলনামূলক বেশি।
নতুন নয়, তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
PCT ব্যবহার করে অ্যান্টিবায়োটিকের সময় নির্ধারণের ধারণা নতুন নয়। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যেও এ ধরনের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ হয়েছে আইসিইউভিত্তিক উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায়।
বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের পরিবেশে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত, তা বোঝার জন্য স্থানীয় গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। চট্টগ্রামের এই গবেষণা সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
গবেষণাটিতে যুক্ত ছিলেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন গবেষক। গবেষণায় অর্থায়ন করেছে যুক্তরাজ্যের Wellcome Trust
গবেষক ডা. ফরহাদ উদ্দীন হাসান চৌধুরীর ভাষ্য, গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল—সেপসিসের রোগীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে PCT কমে গেলে দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক না দিয়ে তা বন্ধ করা নিরাপদ কি না, সেটি পরীক্ষা করা।
সেপসিসের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে। চট্টগ্রামের এই গবেষণায় দেখা গেছে, PCT নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে দেশের বড় পরিসরে এই পদ্ধতি প্রয়োগের আগে আরও গবেষণা এবং হাসপাতালগুলোতে PCT পরীক্ষার সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
What's Your Reaction?