বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি, এখনই সতর্ক হোন
একটি ছোট্ট ভুলই হতে পারে বড় বিপদের কারণ। দেশে বর্ষা শুরু হলেই বাড়তে থাকে ডেঙ্গুর প্রকোপ, আর সামান্য অসতর্কতাই তৈরি করে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। বাড়ির বারান্দা, ছাদ, ফুলের টব, টায়ার কিংবা যেকোনো খোলা পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে এডিস মশা, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডেঙ্গুর ঝুঁকি এড়াতে এখন থেকেই সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
দেশে বর্ষা শুরু হলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। প্রতি বছর এ সময় হাসপাতালে বাড়ে রোগীর চাপ। বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। টব, টায়ার, ছাদ, ড্রেন কিংবা যেকোনো খোলা পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) মশা ডিম পাড়ে।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (NCVBDC)-এর তথ্যমতে, মশার কামড়ের পর ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক দিন সময় লাগে। তাই বৃষ্টিপাতের কিছুদিন পর থেকেই সংক্রমণের হার দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
ডেঙ্গু ভাইরাস (DENV) হলো Flaviviridae পরিবারের একটি আরএনএ (RNA) ভাইরাস। এটি সংক্রমিত স্ত্রী এডিস মশা -Aedes aegypti ও Aedes albopictus এর কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশাটি ভাইরাস বহন করে এবং পরে সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
কেন বর্ষায় ঝুঁকি বাড়ে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার পরিবর্তন শ্বাসতন্ত্রের রোগ, মশাবাহিত রোগ এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তারকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।
ড. লিমায়ের মতে, প্রতি বছর বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যায় এবং আবহাওয়া উষ্ণ থাকে। এই পরিবেশ এডিস মশার বংশবিস্তার এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য অনুকূল।
ঝুঁকি বাড়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
১. বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার পানি জমে। জমে থাকা পানিতে এডিস মশা দ্রুত ডিম পাড়ে ও বংশবিস্তার করে।
২. আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়া মশার বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
৩. ফুলের টব, এসির ট্রে, টায়ার, ডাবের খোসা, বালতি এবং নির্মাণাধীন স্থানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে।
৪. মশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
ইউনাইটেড হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আফসানা বেগমের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয়
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ রোগী যথাযথ পরিচর্যা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
১. পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকুন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
২. প্রচুর তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করুন। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন নিয়মিত পান করুন। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরে পানিশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়তা করে।
৩. জ্বর হলে প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ বা নির্দেশিত মাত্রা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। লিভার, হার্ট বা কিডনির জটিলতা থাকলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৪. ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন–জাতীয় ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনে ডেঙ্গু পরীক্ষা করুন।
যা করবেন না:
১. শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। ডেঙ্গু জ্বরে শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্লেটলেট কমে গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
২. অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্লেটলেট গ্রহণ করবেন না। প্লেটলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে বা শরীরের কোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্লেটলেট বা রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতি খুব কমই দেখা যায়।
৩. পেঁপে পাতার রস বা অন্যান্য ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর করবেন না। অনেকে মনে করেন, পেঁপে পাতার রস খেলে প্লেটলেট বাড়ে। তবে এ দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জ্বর কমে সংকটকাল পেরিয়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্লেটলেট স্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
৪. বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করবেন না। জ্বরের শেষের দিকে রক্তচাপ কমে যাওয়া, মাড়ি, নাক বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইনসহ অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়:
১. পরিপূর্ণ পোশাক পরুন। শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন, বিশেষ করে বাইরে গেলে। সুতি, লিনেন বা ডেনিমের মতো তুলনামূলক মোটা কাপড়ের পোশাক পরলে মশার কামড়ের ঝুঁকি কমে।
২. এডিস মশার সক্রিয় সময় সম্পর্কে সচেতন থাকুন। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে। তবে ঘরের ভেতরে বা আলো-আঁধারি পরিবেশে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই সারাদিনই সতর্ক থাকা জরুরি।
৩. মশা নিরোধক ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিইইটি (DEET) সমৃদ্ধ মশা নিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। পারমেথ্রিনযুক্ত স্প্রে বা দ্রব্য কেবল কাপড়, মশারি বা অন্যান্য সামগ্রীতে ব্যবহার করা উচিত; এটি সরাসরি ত্বকে ব্যবহার করা যাবে না।
৪. এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করুন। এডিস মশা বালতি, ফুলের টব, টায়ার, নারকেলের খোসা, ডাবের খোসা, ড্রাম ও অন্যান্য কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই এসব পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন, অপ্রয়োজনীয় পাত্র সরিয়ে ফেলুন এবং কোথাও পানি জমতে দেবেন না। পাশাপাশি ড্রেন ও পানির পাত্র ঢেকে রাখুন।
গুরুতর ডেঙ্গু প্রাণঘাতী হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতা, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (NCVBDC), ভারত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
Apollo Hospitals।
What's Your Reaction?