ডিভোর্সের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা দায়ী

Oct 5, 2026 - 12:07
 0  3
ডিভোর্সের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা দায়ী

একসময় দাম্পত্যের অভিমান জমে থাকত ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই। এখন সেই অভিমান পৌঁছে যাচ্ছে ফেসবুকের পোস্ট, মেসেঞ্জারের চ্যাট কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের বার্তায়। কে কার ছবিতে লাইক দিলেন, কার সঙ্গে রাতভর কথা হলো, কেন সঙ্গী অনলাইনে থেকেও উত্তর দিলেন না,ছোট এসব বিষয় থেকেই অনেক সময় তৈরি হচ্ছে সন্দেহ, ঈর্ষা ও অশান্তি।

সোশ্যাল মিডিয়া নিজে ডিভোর্সের কারণ এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত বা সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার দম্পতির মধ্যে সংঘাত, ঈর্ষা, অবিশ্বাস ও সম্পর্কের অসন্তুষ্টি বাড়াতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে দূরত্ব তৈরি করে?

কর্মক্ষেত্র বা অন্যান্য কারণে স্বামী-স্ত্রী আলাদা শহরে থাকলে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এতে দূরত্ব কমানো সহজ হলেও অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনো উল্টো সমস্যার কারণ হতে পারে।

সঙ্গী অনলাইনে থেকেও কথা না বললে, মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করলে কিংবা অন্য কারও সঙ্গে বেশি সময় কাটালে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে দম্পতিদের মধ্যে ঈর্ষা, নজরদারি ও সংঘাতের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

পুরোনো মেসেজ-ছবিও ফিরিয়ে আনতে পারে পুরোনো ক্ষত

ডিজিটাল যোগাযোগের একটি বড় পার্থক্য হলো—অনেক কথাই সহজে হারিয়ে যায় না। রাগের মাথায় পাঠানো কোনো মেসেজ, পুরোনো ছবি কিংবা কয়েক বছর আগের কোনো পোস্ট হঠাৎ সামনে চলে আসতে পারে।

ফলে আগে যে ঘটনা নিয়ে দম্পতির মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল, সেটি নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে কোনো পুরোনো সম্পর্ক, সন্দেহ বা বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা থাকলে ডিজিটাল রেকর্ড সেই স্মৃতিকে আবার সক্রিয় করতে পারে।

তবে এখানে মূল সমস্যা প্রযুক্তি নয় বরং পুরোনো আঘাত কীভাবে সামলানো হচ্ছে এবং দম্পতির মধ্যে যোগাযোগ কেমন,সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের সম্পর্ককে তুলনা

সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ সাধারণত জীবনের ভালো মুহূর্তগুলোই বেশি প্রকাশ করেন। ঘুরতে যাওয়া, উপহার পাওয়া, রোমান্টিক ছবি কিংবা সুখী দাম্পত্যের মুহূর্ত—সবই সেখানে দেখা যায়।

কিন্তু এসব পোস্টের আড়ালে একটি সম্পর্কের বাস্তব সমস্যা কী, তা সাধারণত দেখা যায় না। ফলে অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা শুরু হতে পারে। এতে নিজের সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্টি বা হতাশা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে গবেষণা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব একমুখী নয়। এটি যেমন সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করতে পারে, তেমনি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে যোগাযোগ ও সংযোগ বজায় রাখতেও সাহায্য করতে পারে।

সঙ্গীকে সময় না দিয়ে ফোনে ডুবে থাকা

একই ঘরে থেকেও একজন যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, অন্যজনের মনে হতে পারে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সম্পর্কবিজ্ঞানে এই আচরণকে ‘পার্টনার ফাবিং’ বলা হয়—অর্থাৎ সঙ্গীর উপস্থিতি উপেক্ষা করে ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসে মনোযোগ দেওয়া।

সাম্প্রতিক একটি মেটা-বিশ্লেষণে ৫২টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ ধরনের আচরণের সঙ্গে সম্পর্কের সন্তুষ্টি, ঘনিষ্ঠতা ও সঙ্গীর প্রতি সাড়া দেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাত ও ঈর্ষাও বাড়তে পারে।

ডিভোর্সের পেছনে শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়

একটি দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ কাজ করে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগের ঘাটতি, বিশ্বাসের সংকট, পরকীয়া, আর্থিক চাপ, মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক হস্তক্ষেপ এবং অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব—সবই ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই কোনো দাম্পত্য ভাঙনের জন্য শুধু ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং সোশ্যাল মিডিয়া অনেক সময় আগে থেকেই থাকা সম্পর্কের সমস্যাকে আরও দৃশ্যমান বা তীব্র করে তুলতে পারে।

সমস্যা কমাতে যা করবেন

দাম্পত্যে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে অশান্তি কমাতে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে।

ব্যক্তিগত সীমা ঠিক করুন: কে কার ফোন দেখবেন, অনলাইনে কী ধরনের যোগাযোগ গ্রহণযোগ্য—এসব নিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকা ভালো।

সরাসরি কথা বলুন: মেসেজে দীর্ঘ তর্ক না করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনাসামনি বা ফোনে শান্তভাবে আলোচনা করুন।

ফোনমুক্ত সময় রাখুন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় শুধু দুজনের জন্য রাখুন। সেই সময়ে ফোন দূরে রাখলে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়তে পারে।

সন্দেহ হলে নজরদারি নয়: গোপনে ফোন দেখা বা অনলাইন কার্যক্রম অনুসরণ করার বদলে নিজের উদ্বেগ সরাসরি সঙ্গীকে জানান। গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর ঈর্ষা ও নজরদারির সঙ্গে কম সম্পর্ক-সন্তুষ্টির যোগ পাওয়া গেছে।

পুরোনো বিষয় নিয়ে বারবার সংঘাত নয়: অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে সমস্যা থাকলে সেটি পরিষ্কারভাবে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে দম্পতি কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন?

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে নিয়মিত ঝগড়া, অতিরিক্ত সন্দেহ, সঙ্গীর ফোন বা অনলাইন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, দীর্ঘদিনের যোগাযোগহীনতা কিংবা বারবার একই বিষয়ে সংঘাত তৈরি হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে দম্পতি কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। গবেষণায় দম্পতিদের জন্য বিভিন্ন অনলাইন সম্পর্কভিত্তিক হস্তক্ষেপও সম্পর্কের সন্তুষ্টি ও যোগাযোগ উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে বলে দেখা গেছে।

সোশ্যাল মিডিয়া দাম্পত্যের শত্রু নয়, আবার নিরীহও নয়। এর ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহ, তুলনা ও অবহেলার বদলে যদি যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান ও সীমারেখাকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে প্রযুক্তিই দূরত্ব বাড়ানোর বদলে সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি আনতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

লাইফ স্টাইল Vision: বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যকর জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবার, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং জীবনমান সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, গবেষণানির্ভর ও প্রভাবশালী Human Development Platform হওয়া; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ভ্রমণ, পরিবার, ক্যারিয়ার, ফ্যাশন, খাদ্য, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা মানুষকে আরও সচেতন, সুস্থ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।