লিভার সিরোসিস: ঝুঁকি কমাবেন যেভাবে
লিভার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। রক্ত থেকে ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণ, পুষ্টি ও ওষুধ প্রক্রিয়াজাত করা, পিত্ত তৈরি এবং শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রোটিন তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে লিভার।
তবে দীর্ঘদিন ধরে লিভারে প্রদাহ বা অন্য কোনো ধরনের ক্ষতি হলে ধীরে ধীরে সুস্থ লিভার টিস্যুর জায়গায় ফাইব্রোসিস বা শক্ত দাগের টিস্যু তৈরি হতে পারে। এই ক্ষতি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে তাকে লিভার সিরোসিস বলা হয়।
শুধু অ্যালকোহল গ্রহণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ, অতিরিক্ত ওজন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার মতো সমস্যাও সিরোসিসের কারণ হতে পারে।
সিরোসিস হলে লিভারের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু সাধারণত আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। তবে রোগের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে লিভারের আরও ক্ষতি ও জটিলতা কমানো সম্ভব।
লিভার সিরোসিস কী?
লিভারে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতি বা প্রদাহ চলতে থাকলে সুস্থ লিভার কোষের পরিবর্তে ধীরে ধীরে ফাইব্রোসিস বা দাগের টিস্যু তৈরি হয়। একই সঙ্গে লিভারের স্বাভাবিক গঠনও পরিবর্তিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে গেলে লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে এবং সিরোসিসের সৃষ্টি হয়।
সিরোসিসের কারণে লিভারের রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি হতে পারে এবং পোর্টাল হাইপারটেনশন বা লিভারের ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচলের চাপ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে পেটে পানি জমা, খাদ্যনালির শিরা ফুলে যাওয়া এবং রক্তপাতের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সিরোসিসের প্রধান দুটি পর্যায়
১. কমপেনসেটেড সিরোসিস: এই পর্যায়ে লিভারে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে লিভার তার প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে রোগীর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
২. ডিকমপেনসেটেড সিরোসিস: এই পর্যায়ে লিভারের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং সিরোসিসজনিত বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। যেমন—পেটে পানি জমা, জন্ডিস, খাদ্যনালির শিরা থেকে রক্তপাত এবং লিভারের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন বা হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক বা সাধারণ লক্ষণ
-
দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি
-
ক্ষুধামন্দা বা খাবারে অরুচি
-
বমি বমি ভাব
-
ওজন কমে যাওয়া
-
পেটের ওপরের ডান দিকে অস্বস্তি বা ব্যথা
-
হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
-
ত্বকে মাকড়সার জালের মতো ছোট ছোট রক্তনালি দেখা দেওয়া, যাকে স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা বলা হয়
গুরুতর লক্ষণ
-
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
-
পেটে পানি জমে পেট ফুলে যাওয়া বা অ্যাসাইটিস
-
পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
-
ত্বকে সহজে কালশিটে পড়া বা রক্তপাত
-
খাদ্যনালির শিরা থেকে রক্তপাত হলে রক্তবমি বা কালো পায়খানা
-
বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা আচরণে পরিবর্তন
-
শরীরে র্যাশ ছাড়াই চুলকানি
এ ধরনের গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রক্তবমি, কালো পায়খানা, তীব্র দুর্বলতা বা হঠাৎ বিভ্রান্তি হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
কেন হয় লিভার সিরোসিস?
সিরোসিসের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
মেটাবলিক-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার: অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা ও প্রদাহ দীর্ঘমেয়াদে ফাইব্রোসিস এবং সিরোসিসের দিকে যেতে পারে।
হেপাটাইটিস বি ও সি: দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসের সংক্রমণে লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্ষতি হতে পারে। চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ: দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ লিভারে প্রদাহ ও ক্ষতি তৈরি করে সিরোসিসের কারণ হতে পারে।
অন্যান্য কারণ: অটোইমিউন লিভার রোগ, বংশগত কিছু রোগ এবং পিত্তনালির দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণেও সিরোসিস হতে পারে। কিছু ওষুধ বা রাসায়নিক পদার্থের কারণে লিভারে গুরুতর ক্ষতি হলেও তা সিরোসিসের কারণ হতে পারে।
লিভার সিরোসিস প্রতিরোধে যা করবেন
সব ধরনের সিরোসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কমানো যায়।
১. অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে যাদের লিভারে আগে থেকেই সমস্যা রয়েছে, তাদের অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
২. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। সুষম খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
৩. ডায়াবেটিস ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখুন
রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ লিভারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৪. হেপাটাইটিস থেকে সুরক্ষিত থাকুন
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া যেতে পারে। হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা রয়েছে, তাই ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না
কিছু ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে লিভারের ক্ষতি হতে পারে। তাই বিশেষ করে দীর্ঘদিন কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হারবাল বা ভেষজ পণ্যও নিজের ইচ্ছায় নিয়মিত ব্যবহার করা নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
৬. প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
যাদের লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হেপাটাইটিস বা অন্য কোনো ঝুঁকি রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুরুতেই লিভারের সমস্যা শনাক্ত করা গেলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়।
সচেতনতাই লিভার সুস্থ রাখার প্রথম ধাপ
লিভার সিরোসিস একটি দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর রোগ। তবে এর অনেক কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, হেপাটাইটিস বি থেকে সুরক্ষিত থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি কমানো যায়।
লিভার সিরোসিসের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে বা ঝুঁকি থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বা হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
What's Your Reaction?