মাটি ছোঁয়ার অভ্যাসে মিলতে পারে স্বাস্থ্য উপকার
মাটি মানেই ময়লা বা জীবাণু—এমন ধারণাই আমাদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। তাই শিশুদের মাটিতে খেলতে দেওয়া কিংবা খালি হাতে মাটি ধরাকে অনেকেই এড়িয়ে চলেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপদ ও প্রাকৃতিক মাটির সংস্পর্শে থাকা ত্বকের ভালো অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়াতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটানো শুধু মন ভালো রাখে না, শরীরের অণুজীবের জগতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মাটির সংস্পর্শে ত্বকে বাড়তে পারে ভালো অণুজীব
আমাদের ত্বকে অসংখ্য অণুজীব থাকে। এদের সবাই ক্ষতিকর নয়। বরং অনেক অণুজীব ত্বকের স্বাভাবিক পরিবেশ ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতে ভূমিকা রাখে।
ফিনল্যান্ডের গবেষকেরা মাটি ও উদ্ভিদের উপাদানের সঙ্গে ত্বকের সরাসরি যোগাযোগ নিয়ে পরীক্ষা করেন। গবেষণাটি ২০১৯ সালে MicrobiologyOpen জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, অল্প সময় মাটি ও উদ্ভিদজাত উপাদানের সংস্পর্শে আসার পর অংশগ্রহণকারীদের ত্বকে থাকা অণুজীবের বৈচিত্র্য বেড়েছিল। এমনকি পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরও কিছু সময় সেই পরিবর্তন দেখা যায়।
এর মানে এই নয় যে মাটির সব জীবাণু শরীরের জন্য ভালো। বরং গবেষণার মূল বিষয় হলো, প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অণুজীবের সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ ত্বকের স্বাভাবিক অণুজীবের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুদের শরীরেও দেখা গেছে পরিবর্তন
প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে শিশুদের ওপরও গবেষণা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের কয়েকটি ডে-কেয়ারে শিশুদের খেলার জায়গায় বনভূমির মাটি, গাছপালা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ২৮ দিন শিশুদের এই পরিবেশে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়।
২০২০ সালে Science Advances জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, এমন পরিবেশে খেলা শিশুদের ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বেড়েছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরিবর্তনও দেখা যায়।
গবেষকদের ধারণা, প্রকৃতির মাটি ও উদ্ভিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শরীরে বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি বাড়াতে পারে। এই বৈচিত্র্য ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যেও প্রভাব
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সব সময় ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে সেটিকে আবার অতিরিক্ত সক্রিয়ও হওয়া যাবে না। এই ভারসাম্য ঠিক রাখার ক্ষেত্রে শরীরের অণুজীবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ফিনল্যান্ডের শিশুদের নিয়ে করা গবেষণায় প্রকৃতিঘেঁষা পরিবেশে থাকার পর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত কিছু কোষ ও উপাদানে পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে রেগুলেটরি টি-সেল নামের এক ধরনের রোগ প্রতিরোধী কোষের পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়। এই কোষ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
তবে এসব পরিবর্তন দেখে এমন বলা যাবে না যে মাটিতে খেললেই কোনো রোগ প্রতিরোধ করা যাবে। গবেষণাগুলো মূলত শরীরের অণুজীব ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রকৃতির কাছে থাকার সহজ উপায়
এই ধরনের উপকার পেতে বিশেষ কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। নিরাপদ পরিবেশে বাগান করা, গাছের যত্ন নেওয়া, ঘাসের ওপর কিছু সময় হাঁটা বা বসা কিংবা শিশুদের পরিচ্ছন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলতে দেওয়া।এসবের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যায়।
তবে রাস্তার পাশের ময়লা মাটি, শিল্পবর্জ্যযুক্ত জায়গা বা কীটনাশক ও রাসায়নিক দিয়ে দূষিত মাটি থেকে দূরে থাকা জরুরি। মাটি নিয়ে কাজ করার পর ভালোভাবে হাত ধুয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে খাবার খাওয়ার আগে।
শুধু মাটিই নয়, পুরো প্রকৃতির সঙ্গেই সম্পর্ক
গবেষণাগুলোর মূল ধারণা হলো, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির নানা অণুজীবের সঙ্গে বসবাস করেছে। আধুনিক শহুরে জীবনে কংক্রিটের পরিবেশ বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বাভাবিক যোগাযোগ অনেকটাই কমেছে। ফলে গাছপালা, মাটি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শরীরের অণুজীবের বৈচিত্র্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়ছে।
তবে এই বিষয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। প্রকৃতির সংস্পর্শে অণুজীবের পরিবর্তন কতদিন থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের স্বাস্থ্যে কতটা উপকার করে। এসব জানতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।
নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে মাটি, গাছপালা ও ঘাসের সংস্পর্শ ত্বকের অণুজীবের বৈচিত্র্য এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাই পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশে প্রকৃতির কাছে থাকা হতে পারে দৈনন্দিন জীবনের একটি সহজ অভ্যাস।
What's Your Reaction?