গ্যাস নেই, ভরসা এলপিজি; বাড়ছে শিল্পের জ্বালানি ব্যয়

Sep 4, 2026 - 00:01
Sep 4, 2026 - 01:49
 0  7
গ্যাস নেই, ভরসা এলপিজি; বাড়ছে শিল্পের জ্বালানি ব্যয়

গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন শিল্পমালিকরা। বাজার থেকে এলপিজি কেনার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে সরাসরি আমদানির অনুমতি চাইছেন অনেক উদ্যোক্তা। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগে আবেদন করেছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় বয়লার ও উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখার পরিবর্তে বেশি ব্যয় হলেও এলপিজি ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

তবে গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়লেও নতুন করে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বাড়লে দেশের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাড়ছে এলপিজি আমদানি

দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আমদানিও।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫৭ টনে। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি খাতে এলপিজি উৎপাদন ছিল মাত্র ২০ হাজার ৩৮৬ টন। সরকারি উৎপাদন ও বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে দেশে ওই অর্থবছরে এলপিজির সরবরাহ ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টন।

মোট সরবরাহের মধ্যে আমদানির অংশ ছিল ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দেশে এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে।

আমদানির বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে

দেশে এলপিজি আমদানির অনুমোদন রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি করেছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান।

ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টন এলপিজি আমদানি করে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি কোম্পানি আমদানি করেছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন, যা মোট আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ।

আমদানির পরিমাণে শীর্ষে ছিল ওমেরা। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করেছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৩ টন এলপিজি। এরপর মেঘনা ফ্রেশ আমদানি করেছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ টন।

যমুনা স্পেসটেকের আমদানি ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টন এবং বিএম এনার্জি আমদানি করেছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টন।

গ্যাসের ঘাটতিই বাড়াচ্ছে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার

শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি।

গত ২৮ আগস্ট রাত ৮টার হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ছিল ১৬১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট।

প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১৪২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট।

গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট সামাল দিতে শিল্প উদ্যোক্তাদের কেউ উৎপাদন কমাচ্ছেন, আবার কেউ বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করছেন।

বিটিএমএর পরিচালক ও লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্পকারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সংকট আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল বা অন্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় শুধু জ্বালানি ব্যয়ই বাড়ছে না, উৎপাদনের সামগ্রিক খরচও বাড়ছে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এই বাড়তি ব্যয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে।

টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, কাচ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও ধাতুশিল্পের বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এলপিজি ব্যবহার করা যায়। বয়লার, চুল্লি, ড্রায়ার এবং বিভিন্ন ধরনের তাপ উৎপাদনের কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে।

পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলেও ট্যাঙ্কে মজুত এলপিজি ব্যবহার করা সম্ভব। এ কারণে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোর কাছে এলপিজি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে।

সরাসরি আমদানিতে আগ্রহ

শিল্পমালিকদের যুক্তি, স্থানীয় এলপিজি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কিনে ব্যবহারের পরিবর্তে বড় পরিমাণে সরাসরি আমদানি করতে পারলে খরচ কমানো সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে নিজেদের কারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত রাখা গেলে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাও কমবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানার মালিক নিজেরা এলপিজি আমদানি করে কারখানা সচল রাখতে চান।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে এবং সরকার আবেদনগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজিকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দেওয়ায় সরাসরি আমদানির অর্থায়নও তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। ফলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবহারের জন্য এলপিজি আমদানির বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো

তবে সরাসরি এলপিজি আমদানি করতে হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এ জন্য প্রয়োজন হবে বড় স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, ভ্যাপোরাইজার, পাইপলাইন এবং প্রয়োজনীয় অগ্নি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। এসব অবকাঠামো নির্মাণে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ওমেরা এলপিজির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই এলপিজি আমদানি করতে পারবে না। এর জন্য বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্সের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা বেশ ব্যয়বহুল।

তিনি বলেন, হাইড্রোকার্বন ইউনিট থেকে এলপিজি আমদানির বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হয়েছে। কীভাবে এবং কারা এলপিজি আমদানি করতে পারবে, সে বিষয়ে নীতিমালায় বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে।

আজম জে চৌধুরীর মতে, বেসরকারি শিল্পকারখানার মালিকরা সরাসরি আমদানির পরিবর্তে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেন।

এক আমদানিনির্ভরতা থেকে আরেক নির্ভরতা

দেশীয় উৎপাদন খুবই কম হওয়ায় এলপিজির ব্যবহার যত বাড়বে, আমদানির ওপর নির্ভরতাও তত বাড়বে।

বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আনতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের বাজারে এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক বিকল্প হিসেবে এলপিজি শিল্পকারখানাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকলে দেশ এলএনজির মতো আরও একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

ফলে শিল্পের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

চাইলে আমি এটিকে পরবর্তী ধাপে আরও অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী ‘ইত্তেফাক বিজনেস রিপোর্ট’, অথবা দ্য ইকোনোমিস্ট-ধাঁচের ডেটা-ড্রিভেন বিশ্লেষণী প্রতিবেদন হিসেবেও পুনর্গঠন করতে পারি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

শিল্প ভিশন: বাংলাদেশের শিল্পায়ন, উৎপাদন, বাণিজ্য, রপ্তানি ও শিল্পনীতির সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য Industry Intelligence Hub হওয়া; যা নীতিনির্ধারক, শিল্প উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ভাষার প্রধান জ্ঞানভান্ডার ও রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। মিশন: বাংলাদেশের শিল্পখাত, উৎপাদন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, রপ্তানি-আমদানি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME), সরবরাহ শৃঙ্খল এবং শিল্পনীতিকে তথ্য, গবেষণা, ডেটা ও বৈশ্বিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা; যাতে শিল্পোন্নয়ন, প্রতিযোগিতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা যায়।