ঋতু পরিবর্তনে বাড়ে বিষণ্ণতা, জানুন কারণ ও প্রতিকার

Oct 5, 2026 - 12:00
 0  2
ঋতু পরিবর্তনে বাড়ে বিষণ্ণতা, জানুন কারণ ও প্রতিকার

ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতি, দিনের আলো, ঘুমের সময়সূচি ও দৈনন্দিন জীবনযাপনও। আর এই পরিবর্তনের প্রভাব কখনো কখনো পড়তে পারে মনের ওপর। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বারবার মন খারাপ, অতিরিক্ত ঘুম, ক্লান্তি কিংবা কোনো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন? বিষয়টি শুধু সাময়িক মন খারাপ নাও হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বিষণ্ণতার এমন পুনরাবৃত্তি দেখা দিতে পারে, যা পরিচিত সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি) নামে।

দিনের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া, সূর্যের আলোর সংস্পর্শ কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কেউ কেউ লক্ষ্য করেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে তারা কম উদ্যমী, বেশি ঘুমকাতুরে বা অন্যদের থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চাইছেন।

তবে ঋতু পরিবর্তনের সময় সাময়িক মন খারাপ হওয়া আর সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার এক বিষয় নয়।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার কী?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার হলো এক ধরনের বিষণ্ণতা, যা নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারায় দেখা দেয়। এটি সাধারণত শরৎ বা শীতকালে শুরু হয় এবং বসন্ত বা গ্রীষ্মে কমে আসে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বসন্ত বা গ্রীষ্মকালেও এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

শীতকালীন এসএডি আংশিকভাবে দিনের আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। দিনের আলো কমে গেলে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি, ঘুমের ধরণ এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এসএডির সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। জৈবিক, মানসিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঋতু পরিবর্তনের সময় মন খারাপ হওয়া কি স্বাভাবিক?

ঋতু পরিবর্তনের সময় মেজাজ, কর্মশক্তি বা কোনো কাজে আগ্রহের ক্ষেত্রে সাময়িক পরিবর্তন আসতেই পারে। দিনের আলো কমে যাওয়া, দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম বা বাইরে কম সময় কাটানোর মতো বিষয় ঘুম ও অভ্যাসের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে ওই ব্যক্তির এসএডি হয়েছে।

মূল পার্থক্য হলো লক্ষণের তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব। এসএডির ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো প্রায় প্রতি বছর একই সময়ে ফিরে আসতে পারে এবং কাজ, সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

এসএডির সাধারণ লক্ষণ

লক্ষণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। শীতকালীন এসএডির ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—

  • দীর্ঘস্থায়ী মনমরা ভাব

  • কোনো কাজে আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া

  • কর্মশক্তি কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি

  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুম

  • মনোযোগ দিতে সমস্যা

  • ক্ষুধার পরিবর্তন

  • বিশেষ করে মিষ্টি বা শর্করাজাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা

  • সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া

  • হতাশ, মূল্যহীন বা অসহায় বোধ করা

  • বিছানা থেকে ওঠা বা স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করতেও কষ্ট হওয়া

অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালীন এসএডির ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অস্থিরতা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

দিনের আলো কম থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শীতকালীন এসএডির একটি সম্ভাব্য কারণ হলো সূর্যের আলোর সংস্পর্শ কমে যাওয়া। আলো শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দেহঘড়িই মূলত ঘুম ও জাগরণের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করে।

দিনের আলোর পরিমাণে পরিবর্তন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর পাশাপাশি ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন মেলাটোনিন এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা সেরোটোনিনের কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এসব বিষয় ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন কিছু মানুষ নির্দিষ্ট ঋতুতে ঘুম, কর্মশক্তি ও মেজাজে নিয়মিত পরিবর্তন অনুভব করেন। তবে এসএডি একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং শুধু একটি জৈবিক কারণ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না।

কাদের এসএডি হওয়ার ঝুঁকি বেশি?

এসএডি যে কারও হতে পারে। তবে বিষণ্ণতা বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেসব অঞ্চলে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে দিনের আলোর পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য হয়, সেখানেও এসএডি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। পারিবারিক ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে ক্লান্ত বা মনমরা বোধ করলেই এসএডি হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। লক্ষণগুলোর ধরন, স্থায়িত্ব ও পুনরাবৃত্তি বিবেচনা করে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কীভাবে এসএডি নির্ণয় করা হয়?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাধারণত উপসর্গগুলো কী, কখন শুরু হয় এবং সেগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে বারবার সম্পর্কিত কি না, তা জানতে চান।

এ ছাড়া ঘুম, ক্ষুধা, কর্মশক্তি, আগের রোগের ইতিহাস এবং লক্ষণগুলো দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করা হয়।

একই ধরনের উপসর্গ অন্য কিছু শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। যেমন—থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য ধরনের বিষণ্ণতা। তাই দীর্ঘদিনের বা বারবার ফিরে আসা উপসর্গকে অবহেলা না করে সঠিক কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।

এসএডি থেকে মুক্তি পেতে কী করবেন?

এসএডির চিকিৎসা ব্যক্তির উপসর্গ ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি পদ্ধতি কাজে আসতে পারে।

প্রতিদিন কিছুটা সময় আলোতে থাকুন: দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া ও প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় কাটানো উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত রোদে দীর্ঘ সময় থাকা প্রয়োজন নেই।

নিয়মিত জীবনযাপন করুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত খাবারের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত হাঁটা বা পরিমিত শরীরচর্চা মেজাজ ভালো রাখতে এবং কর্মশক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন: মন খারাপ থাকলেও নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে না নিয়ে পরিবার ও কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। সামাজিক যোগাযোগ মানসিকভাবে সহায়ক হতে পারে।

প্রয়োজনে মানসিক চিকিৎসা নিন: বিষণ্ণতার লক্ষণ বেশি হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কথোপকথনভিত্তিক চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।

আলোর বিশেষ চিকিৎসা: শীতকালীন এসএডির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ ধরনের উজ্জ্বল আলোর বাক্স ব্যবহার করা হয়। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। চোখের কিছু সমস্যা বা নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে: কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক বিষণ্ণতার ওষুধ দিতে পারেন। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

যদি মন খারাপ বা বিষণ্ণতার লক্ষণ কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, প্রতি বছর একই সময়ে ফিরে আসে, স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

আর যদি নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসে বা জীবন নিয়ে চরম হতাশা তৈরি হয়, তাহলে অপেক্ষা না করে দ্রুত কাছের মানুষকে জানান এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।

ঋতু বদলের সময় মন-মেজাজে সামান্য পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও তা যদি বারবার ফিরে আসে এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে কারণ শনাক্ত করা, নিয়মিত জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারের লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

লাইফ স্টাইল Vision: বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যকর জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবার, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং জীবনমান সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, গবেষণানির্ভর ও প্রভাবশালী Human Development Platform হওয়া; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ভ্রমণ, পরিবার, ক্যারিয়ার, ফ্যাশন, খাদ্য, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা মানুষকে আরও সচেতন, সুস্থ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।