সোনার খোঁজ মিলেছে জাপানের সমুদ্রের তলদেশে
পৃথিবীর গভীরতম ও সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোতে লুকিয়ে রয়েছে এমন সব মূল্যবান সম্পদ, যা ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার গতিপথই বদলে দিতে পারে। এবার জাপানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের সমুদ্রগর্ভে ডুবে থাকা একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে সোনার সন্ধান পেয়েছেন দেশটির গবেষকেরা। তবে পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে সেখানে খননকাজ চালানো উচিত কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত তথ্যমতে, সমুদ্রের নিচে থাকা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখটিতে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী বিশেষ ধরনের চিমনি রয়েছে। এই হাইড্রোথার্মাল চিমনি থেকে কেবল সোনার ক্ষুদ্র কণা ছড়াচ্ছে না, সেখানে তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য সোনা, যা খালি চোখে বা সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা সম্ভব নয়। এই সোনা মূলত সমুদ্রের তলদেশের বিভিন্ন খনিজ উপাদানের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে। এই বিশেষ খাদের সোনার ঘনত্ব এখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো স্থানে পাওয়া সোনার চেয়ে সর্বোচ্চ। তবে সমুদ্রের তলদেশের এই সক্রিয় ভেন্ট বা মুখগুলোকে বাণিজ্যিক খনি খননের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা জরুরি বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল।
২০১৫ সালে জাপানের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে এই হিগাসি-আওগাশিমা ভেন্ট আবিষ্কৃত হয়। টোকিও থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই হাইড্রোথার্মাল ফিল্ডের পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করেন জাপানের শিজুওকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি সেকেন্ডারি-আয়ন মাস স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে সেখানে অত্যন্ত উচ্চমানের সোনার সন্ধান পেয়েছেন তাঁরা। এই অদৃশ্য ন্যানো কণা লুকিয়ে আছে পাইরাইট নামক একটি সালফাইড খনিজের ভেতরে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে নির্গত গরম ও ধাতুসমৃদ্ধ তরল থেকে এই পাইরাইট তৈরি হয়।
পাইরাইট দেখতে চকচকে লোহা ও সালফারের মিশ্রণ হওয়ায় একে অনেক সময় ফুলস গোল্ড বলা হয়। কিন্তু এবারের আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, সেই বোকার সোনার ভেতরেই আসলে আসল সোনা লুকিয়ে রয়েছে। গবেষকেরা জানান, সেখানে সোনা ন্যানো কণা হিসেবে যেমন আটকে আছে, তেমনি খনিজের রাসায়নিক গঠনের ভেতরে একক পরমাণু হিসেবেও সোনা রয়েছে।
সমুদ্রের অন্যান্য সম্ভাব্য সোনার খনির তুলনায় এই এলাকাটি তুলনামূলকভাবে কম গভীর। সহজে পৌঁছানো যায় এবং এখান থেকে সোনা উত্তোলনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক বেশি। তাই ভবিষ্যতের খনি শিল্পে এই এলাকাকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, তবুও আজ পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে কোনো বাণিজ্যিক সোনার খনি চালু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সমুদ্রতলের খনিজ উপাদান থেকে কম খরচে ও কার্যকর উপায়ে সোনা উত্তোলনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
What's Your Reaction?