সালমান শাহর হত্যা মামলায় ডনকে রিমান্ডে নিতে পুলিশের তদন্ত বিভাগ 

সালমান শাহর হত্যা মামলায় ডনকে রিমান্ডে নিতে পুলিশের তদন্ত বিভাগ 

Aug 25, 2026 - 03:23
Sep 4, 2026 - 02:53
 0  11
সালমান শাহর হত্যা মামলায় ডনকে রিমান্ডে নিতে পুলিশের তদন্ত বিভাগ 

চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ঢাকার আদালতে এ আবেদন করেন।

রিমান্ড আবেদনে ডনকে ‘অত্যন্ত সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির লোক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে তদন্ত সংস্থা। মামলাটি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম সোমবার জানান, আসামিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা।

সিআইডির আবেদনে রিমান্ডের পক্ষে তিনটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এবং এর ভুক্তভোগী দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালে মামলা হওয়ার পর থেকেই তার মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি এ বিষয়ে সরব হয়েছেন। তাই মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে মনে করছে সিআইডি।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ডন অত্যন্ত ‘কৌশলী ও ধূর্ত’ প্রকৃতির। তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া এবং তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হতে পারে। মামলার রহস্য উন্মোচন ও তদন্ত এগিয়ে নিতে এ জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ বলেও দাবি করেছে সিআইডি।

তৃতীয় কারণ হিসেবে ডনের বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত সংস্থা। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় কীভাবে, কেন এবং কার প্ররোচনায় তিনি দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য বের করার প্রয়োজন রয়েছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। ১২ আগস্ট জামিনের আবেদন করা হলে তা না মঞ্জুর হয়।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম গত বছরের ২০ অক্টোবর মামলাটি করেন। অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়। মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের পাশাপাশি কয়েকজন অজ্ঞাত পলাতক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।

চিত্রনায়ক সালমান শাহ, যার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। মৃত্যুর সময় বাংলা চলচ্চিত্রে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তার মৃত্যুর পরপরই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

প্রথমে সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। এ অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অপমৃত্যুর মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি। আদালতের নির্দেশে একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনা ও হত্যার অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।

১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। সেখানে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদন মেনে নেননি তার বাবা। তিনি রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এরপর সালমানের বাবার মৃত্যুর পর মামলাটি চালিয়ে যান তার মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেন।

পরবর্তী সময় মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।

এরপর তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে। প্রায় চার বছর তদন্ত চালানোর পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত বিশ্লেষণ করেও হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এবং স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক কষ্ট থেকেই সালমান আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেন নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তিনি পুনরায় তদন্তের দাবি জানান।

২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে মামলার আসামিদের অব্যাহতি দেন।

এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আবেদনটি গ্রহণ করলেও নানা কারণে দীর্ঘদিন এর শুনানি হয়নি।

সবশেষ গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদের আগের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি যুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগটি তদন্ত করে রমনা মডেল থানাকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেন আদালত।

এই মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় এখন গ্রেপ্তার হয়েছেন অভিনেতা আশরাফুল হক ডন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে সিআইডি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

বিনোদন ভিশন: বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, ডিজিটাল মিডিয়া, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল অর্থনীতি সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য Creative Economy & Cultural Intelligence Platform হওয়া; যা শিল্পী, নির্মাতা, গবেষক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিমনস্ক পাঠকদের জন্য প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। মিশন: চলচ্চিত্র, নাটক, ওটিটি, সংগীত, শিল্পকলা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সৃজনশীল শিল্পকে তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, গবেষণা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উপস্থাপন করা; যাতে সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি তৈরি হয় এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে ইতিবাচক অবদান রাখা যায়।