শিশুর কাশির সিরাপে হতে পারে বিপদ
শিশুর কাশি হলেই কাশির সিরাপ—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে। সব সিরাপ সব বয়সী শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। একই সঙ্গে একাধিক ওষুধ দিলে একই উপাদান বারবার খাওয়ানোর ঝুঁকিও থাকে। তাই সিরাপ দেওয়ার আগে এর উপাদান, বয়সসীমা ও মাত্রা যাচাই করা জরুরি।
শিশুর কাশি হলে দ্রুত উপশমের আশায় অনেক বাবা-মা কাশির সিরাপ দেন। কিন্তু এসব ওষুধে একাধিক সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে। শিশুকে দেওয়া অন্য ওষুধেও একই উপাদান থাকলে অজান্তেই অতিরিক্ত মাত্রা হয়ে যেতে পারে।
তাই শুধু ব্র্যান্ডের নাম নয়, বোতলের গায়ে লেখা সক্রিয় উপাদান, বয়সসীমা ও মাত্রা দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে ডেক্সট্রোমেথরফান, কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যালকোহল, প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন এবং কোডিনের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) মতে, একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া বা নির্ধারিত মাত্রার বেশি খাওয়ানো শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের বেশিরভাগ সংক্রমণ সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশিতে ওষুধের উপকারের প্রমাণও সীমিত।
ডেক্সট্রোমেথরফান
ডেক্সট্রোমেথরফান কাশি কমানোর ওষুধ, যা মস্তিষ্কের কাশি নিয়ন্ত্রণকারী অংশে কাজ করে। অনেক কাশির সিরাপে এটি থাকে। তবে সাধারণ ভাইরাসজনিত কাশিতে শিশুদের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত ১০০ শিশুকে নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, রাতে কাশি কমানো বা ঘুমের মান উন্নত করার ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফান বা ডাইফেনহাইড্রামিন—কোনোটিই প্লাসিবোর তুলনায় বেশি কার্যকর ছিল না। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফানের কিছু উপকার পাওয়া গেছে।
তাই শিশুর বয়স ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শেই এর ব্যবহার করা উচিত। কাশি বেশি হলেই মাত্রা বাড়ানো যাবে না।
ঘুমপাড়ানি অ্যান্টিহিস্টামিন
প্রোমেথাজিন ও ডাইফেনহাইড্রামিনের মতো কিছু অ্যান্টিহিস্টামিন কাশি-সর্দির ওষুধে থাকতে পারে। এগুলো শিশুকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করতে পারে। তবে ঘুমিয়ে পড়া মানেই কাশি কমেছে—এমন নয়।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। এফডিএ দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যান্টিহিস্টামিন বা ডিকনজেস্ট্যান্টযুক্ত সর্দি-কাশির ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক করেছে। এসব ওষুধে গুরুতর, এমনকি জীবনহানিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
অ্যালকোহল
কিছু তরল ওষুধে দ্রাবক বা সহায়ক উপাদান হিসেবে ইথানল বা অ্যালকোহল থাকে। তাই একাধিক ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটির লেবেল দেখা জরুরি।
ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সির মতে, অ্যালকোহলযুক্ত ওষুধ ছোট শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একাধিক এমন ওষুধ একসঙ্গে দিলে শরীরে অ্যালকোহল জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকি নির্ভর করে শিশুর বয়স, ওজন ও ওষুধে থাকা অ্যালকোহলের পরিমাণের ওপর।
প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন
কিছু কাশি-সর্দির সিরাপে জ্বর বা ব্যথা কমানোর ওষুধও থাকে। যেমন প্যারাসিটামল বা কিছু ফর্মুলেশনে আইবুপ্রোফেন।
সমস্যা হয় যখন কাশির সিরাপে থাকা একই ওষুধের পাশাপাশি আলাদাভাবে সেটি দেওয়া হয়। যেমন, সিরাপে প্যারাসিটামল থাকার পরও জ্বরের জন্য আলাদা প্যারাসিটামল দিলে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত মাত্রা চলে যেতে পারে।
তাই সিরাপ দেওয়ার আগে এতে প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা অন্য কোনো জ্বর-ব্যথার ওষুধ আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
কোডিন
কোডিন একটি ওপিওয়েড জাতীয় ওষুধ, যা শরীরে মরফিনে রূপান্তরিত হয়। তবে সবার শরীরে এই প্রক্রিয়া একইভাবে হয় না। কিছু শিশুর শরীরে বেশি মরফিন তৈরি হয়ে গুরুতর শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাশি ও সর্দির জন্য কোডিনযুক্ত ওষুধ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশুদের কাশির চিকিৎসায় কোডিনের কার্যকারিতার পক্ষেও শক্ত প্রমাণ সীমিত।
কাশির ওষুধে আরও সতর্কতা
শিশুদের কাশি ও সর্দির ওষুধ ব্যবহারে সাম্প্রতিক সময়ে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে। ক্লোরফেনিরামিন ম্যালেট ও ফিনাইলেফ্রিন হাইড্রোক্লোরাইডযুক্ত নির্দিষ্ট মাত্রার মিশ্রণ চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এসব ওষুধের লেবেল, প্যাকেজ ইনসার্ট ও প্রচারসামগ্রীতে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্লোরফেনিরামিন একটি অ্যান্টিহিস্টামিন এবং ফিনাইলেফ্রিন একটি ডিকনজেস্ট্যান্ট।
বাবা-মায়ের করণীয়
শিশুর বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক ওষুধ ও মাত্রা নির্ধারণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। তাই শুধু ব্র্যান্ডের নাম দেখে নয়, ওষুধের সক্রিয় উপাদানও দেখে নিতে হবে।
বিশেষ করে নবজাতক ও টডলারদের কাশি বা সর্দির ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণে পর্যাপ্ত তরল, নাক বন্ধ থাকলে স্যালাইন নেজাল ড্রপ এবং ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা বজায় রাখার মতো সহায়ক ব্যবস্থাই অনেক সময় যথেষ্ট।
কাশি নিজে কোনো রোগ নয়, এটি একটি উপসর্গ। তাই সবসময় কাশি বন্ধ করার প্রয়োজনও নেই।
শিশুর কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে কাশির সিরাপ দেওয়া ঠিক নয়। ওষুধ দেওয়ার আগে সক্রিয় উপাদান, বয়সসীমা ও মাত্রা যাচাই করুন। একই উপাদান অন্য কোনো ওষুধে রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করুন। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কাশি-সর্দির ওষুধ না দেওয়াই নিরাপদ। শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
What's Your Reaction?