কমছে তরুণদের মনোযোগ ও স্থিতিশক্তি

Sep 5, 2026 - 21:17
 0  9
কমছে তরুণদের মনোযোগ ও স্থিতিশক্তি

একটা সময় ভুলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা মানসিক ক্লান্তিকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন ২০ বা ৩০-এর কোঠায় থাকা অনেক তরুণও একই ধরনের সমস্যার কথা বলছেন। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও মাথা ভার লাগা, গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে না থাকা, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া কিংবা কোনো তথ্য বুঝতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগার মতো অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই নিত্যদিনের সঙ্গী।

অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকা, অনিয়মিত ঘুম এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ করার অভ্যাস—সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক যেন সব সময়ই ব্যস্ত থাকছে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা ‘ব্রেইন ফগ’ এর মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

সারাক্ষণ ব্যস্ত মস্তিষ্কের ওপর চাপ বাড়ছে

স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের মেসেজ ও ই-মেইল দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই নানা ধরনের তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একই সময়ে একাধিক কাজ সামলানোর চেষ্টা।

একটি কাজ শেষ করার আগেই অন্য কাজে চলে যাওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় কোনো একটি কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। প্রয়োজনের সময় কোনো তথ্য মনে করতে দেরি হয় এবং ধীরে ধীরে মানসিকভাবে নিস্তেজ বা ‘ব্রেইন ফগ’ এর মতো অনুভূতিও হতে পারে।

একসঙ্গে অনেক কাজ করার অভ্যাস মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসেও প্রভাব পড়ে স্মৃতিতে

মানসিক চাপও মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। চাপের পরিস্থিতিতে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস মস্তিষ্কের এমন কিছু প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, যেগুলো মনোযোগ, শেখা, স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এর ফলে একই কথা বারবার পড়েও মনে না থাকা, কাজে মনোযোগ দিতে কষ্ট হওয়া, অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঘুমের ঘাটতিতে বাড়তে পারে সমস্যা

মস্তিষ্ককে সচল ও কর্মক্ষম রাখতে ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং স্মৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে। তাই নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু ঘুম নয়, খাবারের মানও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, পুষ্টির ঘাটতি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরশীলতা সামগ্রিক সুস্থতার পথে বাধা হতে পারে।

মস্তিষ্কের যত্নে ব্যায়াম হতে পারে সহায়ক

শরীরচর্চা শুধু শরীরের জন্য নয়, মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম মানসিক চাপ কমাতে এবং সামগ্রিক সুস্থতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

এর পাশাপাশি প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।

একসঙ্গে সব কাজ করার চেষ্টা নয়

একই সময়ে অনেক কাজ করার বদলে একটি কাজ শেষ করে পরের কাজে যাওয়ার অভ্যাস করা ভালো। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মাঝেও নিয়মিত বিরতি নেওয়া প্রয়োজন।

অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরও যদি নিয়মিত কাজের মেসেজ বা ই-মেইলে যুক্ত থাকার অভ্যাস থাকে, তাহলে সেখানেও একটি নির্দিষ্ট সীমা তৈরি করা জরুরি। দিনের কিছু সময় সম্পূর্ণভাবে কাজ ও ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা যেতে পারে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে মেডিটেশন, মাইন্ডফুলনেস ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামও সহায়ক হতে পারে। অবসর সময়ে বাইরে হাঁটা, পছন্দের কোনো শখ চর্চা করা কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো মনকে চাপমুক্ত রাখতে সাহায্য করতে পারে।

দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি

মাঝেমধ্যে কোনো কথা ভুলে যাওয়া কিংবা কয়েক দিন মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং তা পড়াশোনা, কাজ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে সেটিকে শুধু ব্যস্ততার ফল ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

কারণ একই ধরনের লক্ষণের পেছনে ঘুমের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তাই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

মস্তিষ্ককেও দিতে হবে বিশ্রাম

মস্তিষ্ককে সব সময় ব্যস্ত রাখলেই যে কর্মক্ষমতা বাড়বে, এমনটা নয়। নিরবচ্ছিন্ন তথ্যপ্রবাহ, মানসিক চাপ ও বিশ্রামের অভাব বরং ধীরে ধীরে মনোযোগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কাজের পাশাপাশি মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার এবং ডিজিটাল ব্যবহারে সীমা তৈরি করা জরুরি।

ব্যস্ত জীবনে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকারই অংশ। আর স্মৃতি বা মনোযোগের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

লাইফ স্টাইল Vision: বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যকর জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবার, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং জীবনমান সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, গবেষণানির্ভর ও প্রভাবশালী Human Development Platform হওয়া; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ভ্রমণ, পরিবার, ক্যারিয়ার, ফ্যাশন, খাদ্য, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা মানুষকে আরও সচেতন, সুস্থ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।