মাদকের প্রভাবে হ্যালুসিনেশন
হ্যালুসিনেশন হলো এক ধরণের মানসিক বা শারীরিক অনুভূতি, যেখানে কোনো বাহ্যিক উপস্থিতি ছাড়াই মানুষ এমন কিছু দেখে, শোনে, ঘ্রাণ পায় বা অনুভব করে যা বাস্তবে পুরোপুরি অবাস্তব।এটি মূলত মস্তিষ্কের সংবেদনশীল প্রক্রিয়াকরণে বিভ্রান্তির কারণে ঘটে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকদ্রব্য-ইয়াবা, মেথামফেটামিন, কোকেন, এলএসডি, গাঁজা এবং কিছু অন্যান্য মাদক মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ও রাসায়নিক বার্তাবাহকের (নিউরোট্রান্সমিটার) স্বাভাবিক কার্যকারিতা সরাসরি পরিবর্তন করে ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, হ্যালুসিনোজেনিক বা সাইকোঅ্যাকটিভ ড্রাগগুলো মানুষের ইন্দ্রিয়, আবেগ এবং চিন্তাশক্তির নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুপথগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিভ্রান্ত করে।
কারণ:ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউস (NIDA)-এর মতে,মাদকভেদে হ্যালুসিনেশন হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১.সাইকেডেলিক বা হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ (যেমন: এলএসডি, ম্যাজিক মাশরুম): এই মাদকগুলো মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টরকে (Serotonin \(5-HT_{2A}\) receptors) অতিরিক্ত উদ্দীপিত করে, যা মানুষের মেজাজ, অনুভূতি এবং বাস্তবতা উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
২.ডিসোসিএটিভ ড্রাগ (যেমন: পিছুপি বা কেটামিন): এই মাদকগুলো মস্তিষ্কের গ্লুটামেট রিসেপ্টরকে (Glutamate NMDA receptors) ব্লক করে দেয়। ফলে ব্যবহারকারী তার চারপাশের পরিবেশ এবং নিজের শরীর থেকেই বিচ্ছিন্ন বোধ করেন।
৩.সাইকোস্টেমুল্যান্টস (যেমন: কোকেন, অ্যাম্ফেতামিন): এ ধরনের মাদক মস্তিষ্কের ডোপামিন (dopamine) সিস্টেমকে অতিমাত্রায় সক্রিয় করে ফেলে, যার কারণে মাদকাসক্তদের মধ্যে হ্যালুসিনেশনসহ তীব্র প্যারানিয়া (অযৌক্তিক ভয় বা সন্দেহ) দেখা দিতে পারে।
৪.মাদক ছাড়ার প্রক্রিয়া (Withdrawal): NIDA-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন অ্যালকোহল অ্যাবিউজ অ্যান্ড অ্যালকোহলিজম (NIAAA)-এর মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের পর হঠাৎ তা ছেড়ে দিলে মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়। একে 'ডেলিরিয়াম ট্রেমেন্স' (Delirium Tremens) বলা হয়, যার ফলে মারাত্মক হ্যালুসিনেশন ও খিঁচুনি হতে পারে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ (NIDA)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মাদকে আসক্তি, অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ (ওভারডোজ) এবং মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে ওপিওড (যেমন—হিরোইন, প্রেসক্রিপশন পেইনকিলার) এবং মেথামফেটামিন অন্যতম। এ ছাড়া অ্যালকোহল, কোকেন এবং সিন্থেটিক ড্রাগগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
বাহ্যিক কোনো উদ্দীপক ছাড়াই ব্যক্তি এমন কিছু দেখতে, শুনতে, গন্ধ পেতে বা অনুভব করতে পারেন যা বাস্তবে নেই, তবে তাঁর কাছে তা একদম বাস্তব বলে মনে হয়। এটি প্রধানত পাঁচটি ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করতে পারে—
১.শোনা (অডিটরি হ্যালুসিনেশন): অবাস্তব শব্দ বা কারও কণ্ঠস্বর শোনা। এটি সবচেয়ে সাধারণ হ্যালুসিনেশন। ব্যক্তি কানে ফিসফিসানি, গান, অন্য কোনো শব্দ অথবা পরিচিত বা অপরিচিত কারও কথা বলার আওয়াজ শুনতে পারেন।
২.দেখা (ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন): বাস্তবে নেই এমন কোনো কিছু দেখা। এটি হতে পারে আলোর ঝলকানি, জ্যামিতিক নকশা, ছায়া, বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক কোনো মানুষ, প্রাণী ও দৃশ্য।
৩.স্পর্শ বা অনুভূতি (ট্যাকটাইল হ্যালুসিনেশন): ত্বকে অবাস্তব স্পর্শ বা নড়াচড়া অনুভব করা। যেমন, শরীরে পোকা হেঁটে বেড়াচ্ছে বা কেউ ছুঁয়ে দিচ্ছে এমন অনুভূতি। এমনকি শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করছে বলেও মনে হতে পারে।
৪.ঘ্রাণ ও স্বাদ (অলফ্যাক্টরি ও গ্যাস্ট্রেটরি হ্যালুসিনেশন): কোনো উৎস ছাড়াই অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া বা মুখের ভেতর অস্বাভাবিক স্বাদ পাওয়া। যেমন—ধোঁয়া না থাকলেও পোড়ার গন্ধ পাওয়া বা মিষ্টি/ধাতব স্বাদ লাগা।
প্রতিরোধের উপায় :
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের হ্যালুসিনেশন (অবাস্তব কিছু দেখা বা শোনা) প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো মাদক গ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। National Institute on Drug Abuse (NIDA)-এর গাইডলাইন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
১.মাদক থেকে বিরত থাকা: হ্যালুসিনেশন সৃষ্টিকারী মাদক (যেমন- গাঁজা, কোকেন, এলএসডি, মেথামফেটামিন) ব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। মাদক শরীর থেকে বের হয়ে গেলেই সাধারণত উপসর্গগুলো কমতে শুরু করে।
২.মেডিকেশন বা ওষুধ: তীব্র হ্যালুসিনেশনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টি-সাইকোটিক বা সিডেটিভ জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য রক্ষা করে।
৩.থেরাপি ও কাউন্সেলিং: সাইকো-সোশ্যাল থেরাপি (বিশেষ করে CBT - Cognitive Behavioral Therapy) হ্যালুসিনেশনের সময় মানসিক ভয় কাটাতে এবং মাদকাসক্তি প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর।
৪.নিরাপদ পরিবেশ: হ্যালুসিনেশন হলে রোগীকে শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশে রাখতে হবে, যাতে তারা নিজেদের বা অন্যদের কোনো ক্ষতি করতে না পারেন।
৫.পারিবারিক সহায়তা: রোগীর সাথে কোমল আচরণ করতে হবে এবং তাকে একা না রেখে সবসময় পরিবারের বা বিশেষজ্ঞ কারো তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে।
৬.মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা: মাদক ছাড়ার পরও হ্যালুসিনেশন থাকলে তা অন্য কোনো প্রাথমিক মানসিক রোগের (যেমন- স্কিজোফ্রেনিয়া) লক্ষণ হতে পারে, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত চিকিৎসা (Dual Diagnosis Care) প্রয়োজন হয়।
হ্যালুসিনেশন মস্তিষ্কের ওপর মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং মাদক থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO),ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট আন ড্রাগ অ্যাবিউজ(NIDA),ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন অ্যালকোহল অ্যাবিউজ এন্ড অ্যালকোহলিজম(NIAAA)
What's Your Reaction?