সুদ নয়, বিনিয়োগে বড় বাধা আস্থার সংকট

Sep 20, 2026 - 18:55
Sep 20, 2026 - 18:55
 0  3
সুদ নয়, বিনিয়োগে বড় বাধা আস্থার সংকট

গত কয়েক বছরে ব্যবসায়ীরা ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ এবং ঋণের খরচ কমাতে নীতিসুদ কমানোরও দাবি ছিল তাদের। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগস্ট থেকে নীতিসুদ ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছে।  তবে ঋণের সুদ কমলেও বেসরকারি খাতে ঋণগ্রহণ ও বিনিয়োগে এখনো প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমানত ও ঋণের ভারিত গড় সুদের হার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ ও ১২ দশমিক ১৬ শতাংশে উঠেছিল, যা অন্তত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর ধীরে ধীরে সুদের হার কমেছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে আমানতের গড় সুদ ৬ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ঋণের সুদ ১১ দশমিক ৮১ শতাংশে নেমে আসে। এ ছাড়া চলতি বছরের জুনে এক বছর আগের তুলনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ফলন এবং কলমানি সুদের হারও কমেছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের অর্থায়নের প্রধান উৎস ব্যাংকিং ব্যবস্থা হওয়ায় সুদের এই নিম্নমুখী প্রবণতা ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর কথা।

কিন্তু বাস্তবে বেসরকারি খাত এখনো ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হলেও তা ডিসেম্বরের মধ্যে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করার বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, শুধু সুদের হার কমিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব নয়; এর জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও ব্যবসার কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

তার ভাষায়, ‘সুদের হার কমানোর উদ্দেশ্য হলো ঋণগ্রহণ উৎসাহিত করা।

কিন্তু ব্যবসায়ীরা তখনই বিনিয়োগ করবেন, যখন তারা পর্যাপ্ত চাহিদা, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং বিনিয়োগ থেকে যুক্তিসংগত মুনাফার সম্ভাবনা দেখবেন।’
তাসকীন আহমেদ বলেন, কাগজে-কলমে সস্তা ঋণ আকর্ষণীয় হলেও উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন মূলধন বিনিয়োগে ঝুঁকতে পারছেন না। এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার একটি অংশ অব্যবহৃত থাকছে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতও ব্যাবসায়িক আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন নতুন বিনিয়োগের বদলে নগদ অর্থ সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান আসিফ ইব্রাহিমও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, সুদের হারের বাইরে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বড় জায়গা হলো জ্বালানি সংকট, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের ঝুঁকি।

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নিতে চাইছে না। নতুন বিনিয়োগ থেকে যে আয় হবে, তা দিয়ে ঋণের খরচ মেটানো যাবে কি না—এ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা গভীর হওয়ায় ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানের মতে, ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সুদের হার কমার একটি কারণ হতে পারে। ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে অনাগ্রহী হলে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও কমে যায়।

তিনি বলেন, সুদের হার কমাকে অর্থনীতির উন্নতির স্বয়ংক্রিয় সংকেত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কম সুদ বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের অর্থায়ন ব্যয় কমাতে পারে; কিন্তু বিনিয়োগ দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি কমে যেতে পারে।

আশিকুর রহমানের মতে, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বাজারে প্রবেশাধিকার ও ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা শুধু সস্তা ঋণ দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, রাজনৈতিক ও নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক দীন ইসলাম বলেন, কম ঋণ প্রবৃদ্ধি আসলে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের দুর্বলতাকেই তুলে ধরছে। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকলে শুধু সুদের হার কমিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। এর ফলে উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা—সবই বাধাগ্রস্ত হতে পারে ।

তার মতে, ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে চাহিদা পুনরুদ্ধার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, বিনিময় হার ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশে পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কর্টল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক বিরূপাক্ষ পাল বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকায় ঋণের খরচ এখনো তুলনামূলক বেশি এবং নতুন বিনিয়োগের আকর্ষণ কম।

রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তাও অনেক শিল্প ও কারখানার বিনিয়োগ আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে। তাই শুধু ঋণ সস্তা করলেই হবে না, ব্যবসা পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয়ও কমাতে হবে।

তিনি বলেন, আগামী এক থেকে দুই বছরে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেয়েও দেশে ইতিমধ্যে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগগুলো টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
 
গত ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিজনেস অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধাক্কায় বাংলাদেশ এক ধরনের ‘দ্বিমুখী চাপের’ মধ্যে রয়েছে। শুল্ক আরোপ, কভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মাহবুবুর রহমানের মতে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণের খরচের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানিসংকট। অর্থাৎ অর্থের দাম কমানো যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা নিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

বাণিজ্য ও অর্থনীতি Vision: বাংলা ভাষায় ব্যবসা, অর্থনীতি, আর্থিক বাজার, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বিশ্লেষণের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য Business & Economic Intelligence Platform হওয়া; যা নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, গবেষক, করপোরেট নেতা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধান রেফারেন্স ও জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশকে তথ্য, গবেষণা, ডেটা, আন্তর্জাতিক তুলনা এবং বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতার মাধ্যমে উপস্থাপন করা; যাতে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বিকশিত হয়।