মানুষ যে কারণে অপমানের স্মৃতি ভোলে না
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি দিন। আপনি নিজের কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ মস্তিষ্ক ২০১৬ সালের কোনো এক পার্টিতে বলা বিব্রতকর কথাটি আবার মনে করিয়ে দিল। অন্যরা হয়তো ঘটনাটি ভুলেই গেছে, কিন্তু আপনার কাছে সেটি এখনও স্পষ্ট। এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আবেগের সঙ্গে জড়িত ঘটনা সাধারণ অভিজ্ঞতার তুলনায় বেশি শক্তভাবে মনে গেঁথে যেতে পারে।
সব স্মৃতি একইভাবে সংরক্ষিত হয় না। কোনো ঘটনা যদি আমাদের লজ্জিত, ভীত, আনন্দিত বা গভীরভাবে অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে সেই আবেগ স্মৃতিটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। বিশেষ করে অন্য মানুষের সামনে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে হুমকি তৈরি হলে ঘটনাটি আমাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতে পারে।
বিব্রতকর মুহূর্তে সাধারণত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়। মস্তিষ্ক তখন ঘটনাটিকে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ, আবেগের তীব্রতা স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
সামাজিক প্রত্যাখ্যান কেন এত কষ্ট দেয়
গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক প্রত্যাখ্যান বা বিচ্ছিন্নতার সময় মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চল সক্রিয় হয়, যেগুলো শারীরিক ব্যথার অনুভূতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক অপমান আর শারীরিক ব্যথা মস্তিষ্কে পুরোপুরি একইভাবে কাজ করে। বরং দুটির মধ্যে কিছু স্নায়বিক প্রক্রিয়ার মিল পাওয়া গেছে।
মানুষ সামাজিক প্রাণী। তাই অন্যের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, অপমানিত হওয়া বা নিজের অবস্থান নিয়ে হুমকি অনুভব করা মানসিকভাবে বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে। কোনো ঘটনা যদি আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, মস্তিষ্ক সেটিকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতামূলক তথ্য হিসেবেও ধরে রাখতে পারে।
কেন একই স্মৃতি বারবার ফিরে আসে
কোনো বিব্রতকর ঘটনা বারবার মনে পড়ার অর্থ সবসময় এই নয় যে মস্তিষ্ক সেটি ভুলতে পারছে না। অনেক সময় আমরা ঘটনাটি নিয়ে বারবার ভাবি, কী বলা উচিত ছিল বা অন্যরা আমাদের কীভাবে দেখেছিল—এসব নিয়ে চিন্তা করি। ফলে স্মৃতিটির সঙ্গে যুক্ত আবেগ আবারও সক্রিয় হতে পারে।
কোনো ঘটনার পর সেটিকে নিয়ে কথা বলা, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা কিংবা সময়ের সঙ্গে ঘটনাটিকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা অনেক ক্ষেত্রে এর মানসিক প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে আমরা যখন বুঝতে পারি যে ঘটনাটি অন্যদের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল, বাস্তবে হয়তো ততটা ছিল না।
মস্তিষ্ক আপনাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে
বিব্রতকর স্মৃতি মনে পড়া কখনো কখনো মস্তিষ্কের শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। অতীতে কোনো পরিস্থিতিতে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হলে মস্তিষ্ক ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়া সবসময় নিখুঁত নয়। কোনো ঘটনা বাস্তবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেটি আমাদের মনে তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। ফলে বহু বছর আগের একটি ছোট বিব্রতকর ঘটনাও হঠাৎ মনে পড়ে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
স্পটলাইট এফেক্টের প্রভাব
মানুষ প্রায়ই মনে করে, তার করা কোনো বিব্রতকর কাজ অন্যরা অনেক বেশি লক্ষ্য করেছে এবং মনে রেখেছে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় স্পটলাইট এফেক্ট। অর্থাৎ, আমরা নিজেদের আচরণ ও উপস্থিতিকে অন্যরা যতটা খেয়াল করছে বলে মনে করি, বাস্তবে অনেক সময় তা তার চেয়ে কম।
ফলে কোনো অনুষ্ঠানে ভুল কথা বলা, হোঁচট খাওয়া বা অস্বস্তিকর কিছু করে ফেলার ঘটনা আমাদের কাছে অনেক বড় মনে হলেও সেখানে থাকা অন্যরা হয়তো কিছুক্ষণ পরই সেটি ভুলে গেছে।
অর্থাৎ, যে স্মৃতিটি আপনার কাছে বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, সেটি অন্য কারও কাছে হয়তো সামান্য একটি ঘটনা মাত্র। নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে বারবার মনে করার কারণেই সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতে পারে।
তাহলে কি অপমানের স্মৃতি ভুলে যাওয়া সম্ভব
পুরোনো বিব্রতকর স্মৃতি মনে পড়া মানুষের স্বাভাবিক মানসিক অভিজ্ঞতার অংশ। কোনো ঘটনা মনে পড়লেই সেটি আপনার সমস্যা বা মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
সময়, নতুন অভিজ্ঞতা এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার মাধ্যমে এর আবেগীয় প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতীতের একটি বিব্রতকর মুহূর্তকে বর্তমানের নিজের পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখা।
অপমানের স্মৃতি বারবার ফিরে আসা আসলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজেরই অংশ। তবে মনে রাখতে হবে, আপনি যে ঘটনাকে এত বড় করে মনে রাখছেন, অন্যরা হয়তো সেটি অনেক আগেই ভুলে গেছে।
What's Your Reaction?