ভুলে যাওয়া কখন ডিমেনশিয়ার লক্ষণ
বাজারে গিয়ে কী কিনতে হবে মনে পড়ছে না, চাবিটা কোথায় রেখেছেন খুঁজে পাচ্ছেন না কিংবা পরিচিত কারও নাম হঠাৎ মনে পড়ছে না,বয়স বাড়ার সঙ্গে এমন ঘটনা কমবেশি সবারই হতে পারে। কিন্তু ভুলে যাওয়ার এই অভ্যাস যখন ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।পরিচিত মানুষকে চিনতে সমস্যা হয় কিংবা নিজের পরিচিত জায়গাতেও পথ হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তখন বিষয়টি আর সাধারণ ভুলে যাওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সেখানেই সামনে আসে ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝাইমার্সের মতো জটিল স্নায়বিক সমস্যা। শুধু রোগী নন, দীর্ঘদিন ধরে এই অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন পরিবারের সদস্যরাও।
ডিমেনশিয়া মানেই শুধু স্মৃতিভ্রম নয়
ডিমেনশিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এটি এমন একটি সামগ্রিক অবস্থা, যেখানে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও দৈনন্দিন কাজ করার মতো মস্তিষ্কের বিভিন্ন সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। অ্যালঝাইমার্স রোগ ডিমেনশিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। স্ট্রোকসহ অন্য কিছু মস্তিষ্কের রোগ থেকেও ডিমেনশিয়া হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন রোগী যুক্ত হন। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়লেও ডিমেনশিয়াকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
অ্যালঝাইমার্সে কী ঘটে মস্তিষ্কে?
অ্যালঝাইমার্স একটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া মস্তিষ্কের রোগ। এতে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ও তাদের মধ্যকার যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এর প্রভাবে স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
শুরুতে সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, একই কথা বারবার বলা, জিনিসপত্র কোথায় রাখা হয়েছে ভুলে যাওয়া বা পরিচিত কাজ করতে সমস্যা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পরে পরিচিত মানুষ বা জায়গা চিনতে সমস্যা, দৈনন্দিন কাজে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন এবং আচরণগত পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
কখন ভুলে যাওয়া নিয়ে চিন্তার কারণ?
প্রতিদিনের ছোটখাটো ভুলে যাওয়া সবসময় রোগের লক্ষণ নয়। তবে নিচের পরিবর্তনগুলো নিয়মিত ঘটতে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন—
◑সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা বারবার ভুলে যাওয়া
◑একই প্রশ্ন বারবার করা
◑পরিচিত জায়গায় গিয়েও পথ হারিয়ে ফেলা
◑পরিচিত মানুষকে চিনতে সমস্যা হওয়া
◑দৈনন্দিন পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা হওয়া
◑কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়া
◑সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সমস্যা সমাধানে আগের তুলনায় বেশি অসুবিধা হওয়া
◑সময়, স্থান বা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়া
◑আচরণ, মেজাজ বা ব্যক্তিত্বে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসা
এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রোগীর পাশাপাশি লড়াই করতে হয় পরিবারকেও
ডিমেনশিয়া শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনেই প্রভাব ফেলে না। পরিবারের সদস্যদের ওপরও এর বড় ধরনের মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। WHO-ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি কেয়ারগিভার ও পরিবারের ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাবের কথা জানিয়েছে।
একজন প্রিয় মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত মুখ চিনতে না পারলে পরিবারের জন্য সেটি অত্যন্ত কষ্টকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। আবার রোগী একা বাইরে বেরিয়ে গেলে পথ হারানোর আশঙ্কা, রান্নাঘর বা বাথরুম ব্যবহারের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি—এসব নিয়েও পরিবারের সদস্যদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়।
একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় বারবার
ডিমেনশিয়ার একটি কঠিন দিক হলো একই কথা বা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসা। কয়েক মিনিট আগের কথাও রোগী ভুলে যেতে পারেন। ফলে পরিবারের সদস্যদের একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে হয়।
এ সময় বিরক্তি বা রাগ দেখালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। WHO-এর কেয়ারগিভার নির্দেশিকায় ধৈর্য ধরে, সহজ ভাষায় এবং শান্তভাবে যোগাযোগ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সন্ধ্যার পর অস্থিরতা বাড়তে পারে
কিছু ডিমেনশিয়া রোগীর ক্ষেত্রে দিনের শেষভাগে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, ভয় বা আচরণগত পরিবর্তন বাড়তে পারে। ফলে সন্ধ্যা ও রাতের সময় পরিবারের সদস্যদের বাড়তি নজরদারি করতে হতে পারে।
এর প্রভাব কেয়ারগিভারের ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। তাই পরিবারের একজনের ওপর পুরো দায়িত্ব না দিয়ে সম্ভব হলে অন্য সদস্যদের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কেয়ারগিভারের নিজের যত্নও জরুরি
দীর্ঘদিন একজন ডিমেনশিয়া রোগীর দেখাশোনা করতে গিয়ে কেয়ারগিভার নিজেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে।
তাই রোগীর যত্নের পাশাপাশি কেয়ারগিভারেরও বিশ্রাম, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া দরকার। WHO কেয়ারগিভারদের নিজেদের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দিতে এবং প্রয়োজন হলে পরিবারের অন্য সদস্য ও পেশাদারদের সহায়তা নিতে পরামর্শ দেয়।
ঝুঁকি কমাতে কী করা যায়?
ডিমেনশিয়া পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জ্ঞানীয় অবক্ষয় ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার, ধূমপান এড়িয়ে চলা, ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ না করা এবং রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকাও উপকারী হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে ছোটখাটো কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু ভুলে যাওয়ার সঙ্গে যদি পরিচিত মানুষ বা জায়গা চিনতে সমস্যা, দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা, আচরণগত পরিবর্তন কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বিষয় যুক্ত হয়, তাহলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
ডিমেনশিয়া শুধু একজন মানুষের রোগ নয়—এটি পুরো পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক বাস্তবতা। তাই দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগীর পাশাপাশি কেয়ারগিভারের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
What's Your Reaction?