ব্রেন ফগ কেন হয়, এটা কি বিপজ্জনক
ব্রেইন ফগ (Brain Fog) কোনো রোগ নয়, এটি মূলত মানসিক বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগের অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক ক্লান্তির একটি সমষ্টি।
দিনের শুরুতেই হাজারো কাজ। মুঠোফোনের অবিরাম নোটিফিকেশন আর প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রের চাপে আমরা যেন ২৪ ঘণ্টা যন্ত্রের মতো কাজ করে চলেছি। কিন্তু কখনো কি এমন হয় যে কোনো কাজ করতে গিয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না? চিন্তাশক্তি যেন ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে? কিছু পড়ছেন কিন্তু বুঝতে সমস্যা হচ্ছে বা প্রিয় কারও নাম মনে করতে গিয়ে হঠাৎ আটকে যাচ্ছেন?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকেই বলে ‘ব্রেন ফগ’। এটি কোনো একক রোগ নয়; বরং উপসর্গ, মানসিক স্বচ্ছতা ও মনোযোগের অভাবের একটি সংকেত।
ব্রেন ফগে কী ঘটে
ব্রেন ফগ হলে মস্তিষ্ক স্বভাবতই তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রতিদিনের কাজগুলোও মনে হতে থাকে কঠিন। এর সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো—
মনোযোগের তীব্র অভাব: দীর্ঘক্ষণ কোনো একটি কাজে মন বসানো কঠিন হয়ে পড়ে। অফিসের কাজ হোক বা ঘরের কোনো হিসাব, বারবার খেই হারিয়ে ফেলেন।
সিদ্ধান্তহীনতা: ছোটখাটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খেতে হয়। যেন মস্তিষ্ক কোনো সমাধানই দিতে পারছে না।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস: অতি সম্প্রতি করা কোনো কাজ বা পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়া। চাবি কোথায় রেখেছেন কিংবা জরুরি কোনো ফাইল কোথায় রাখলেন, খুঁজে পেতে বারবার বেগ পেতে হয়।
মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি: সারাক্ষণ একধরনের অবসাদ অনুভব করা। শরীর বিশ্রাম পাওয়ার পরও যেন মস্তিষ্ক বিশ্রাম পাচ্ছে না, এমনটা মনে হতে পারে।
চিন্তার জড়তা: মনে হয়, মাথায় যেন কুয়াশা জমে আছে। কোনো তথ্য স্পষ্টভাবে বুঝতে সমস্যা হওয়া বা দ্রুত কথা বলার সময় শব্দ খুঁজে পেতে দেরি হওয়ার সমস্যাও হতে পারে।
কেন এমন হয়
ব্রেন ফগ হলে সারাক্ষণ একধরনের অবসাদ অনুভব হয়।ব্রেন ফগ মূলত মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ বা দীর্ঘমেয়াদি অবহেলার সংকেত।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ব্রেন ফগ কোনো একক রোগ নয়; এটি মূলত মনোযোগের অভাব, মানসিক ক্লান্তি এবং অস্পষ্ট চিন্তার একটি যৌথ উপসর্গ। এটি প্রধানত অপর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং ভাইরাল সংক্রমণ বা শারীরিক অসুস্থতার কারণে হয়ে থাকে।
প্রধান কারণসমূহ
-
ঘুমের ঘাটতি: পর্যাপ্ত বা মানসম্মত ঘুমের অভাবে মস্তিষ্ক তার ক্লান্তি ও বর্জ্য পদার্থ দূর করতে পারে না।
-
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপের কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা স্পষ্ট চিন্তায় বাধা দেয়।
-
সংক্রমণ ও অসুস্থতা: কোভিড-১৯ বা এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার (Long COVID) পর স্নায়বিক দুর্বলতা হিসেবে ব্রেন ফগ দেখা দিতে পারে।
-
পুষ্টি ও জীবনযাত্রা: শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন (যেমন ভিটামিন বি-১২), খনিজ বা পানির ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এর ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতিকার ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
-
প্রতিদিন রাতে নিয়মিত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা গভীর ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা।
-
শরীর হাইড্রেটেড রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা।
-
প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করা।
-
নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা বা ইয়োগা করা, যা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়ায়
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পরও যদি এ লক্ষণগুলো না কমে বাড়তে থাকে, তবে তা অন্য কোনো রোগের সংকেত হতে পারে। যেমন বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ বা স্নায়বিক কোনো জটিলতা। দীর্ঘদিনের স্মৃতিভ্রম বা দৈনন্দিন কাজে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ব্রেন ফগ একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে মস্তিষ্কের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সঠিক পুষ্টি এবং প্রশান্তি প্রয়োজন। জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন এনে আমরা আমাদের মস্তিষ্ককে সচল ও কুয়াশামুক্ত রাখতে পারি।
তথ্যসূএ:
ডা. হিমেল বিশ্বাস,স্নায়ুরোগ বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।
What's Your Reaction?