বাংলাদেশের চালে আর্সেনিক: আতঙ্ক নয়, বড় গবেষণার সংকেত

Sep 25, 2026 - 15:45
Sep 25, 2026 - 17:20
 0  3
বাংলাদেশের চালে আর্সেনিক: আতঙ্ক নয়, বড় গবেষণার সংকেত

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চাল কতটা নিরাপদ? নতুন একটি পাইলট গবেষণা এই প্রশ্নের সহজ কোনো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেয়নি। বরং বাজারের চালে কিছু দূষকের মাত্রা নিয়ে আশ্বস্ত হওয়ার মতো তথ্যের পাশাপাশি অজৈব আর্সেনিক নিয়ে দিয়েছে নজরদারির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের অধীন রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে (আরএএল) পরিচালিত গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ১৭টি বাজার থেকে ১০৪টি বাণিজ্যিক চালের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং ধান চাষে ব্যবহৃত নির্বাচিত ২২টি বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশের পাশাপাশি নমুনাগুলোতে অজৈব আর্সেনিকের উপস্থিতিও পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফল ছিল মিশ্র।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত নমুনাগুলোতে ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং নির্বাচিত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ অনুমোদিত সীমার নিচে ছিল। কিন্তু ১০৪টি নমুনার মধ্যে ১৯টিতে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা আন্তর্জাতিক খাদ্যমান নির্ধারণকারী সংস্থা কোডেক্সের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা—প্রতি কেজিতে ০.২০ মিলিগ্রাম—অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ প্রায় ১৮ শতাংশ নমুনায় এই সীমা ছাড়িয়েছে এবং ৮২ শতাংশ নমুনা সীমার মধ্যে ছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: কোনো নমুনায় নির্ধারিত সীমার বেশি আর্সেনিক পাওয়া যাওয়া এবং সেই চাল খেলে একজন মানুষ নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বেন—এই দুটি বিষয় এক নয়।

কেন আর্সেনিক গুরুত্বপূর্ণ?

অজৈব আর্সেনিক দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের কিছু অঞ্চলের মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক রয়েছে। সেচের পানির মাধ্যমে সেই আর্সেনিক কৃষিজমিতে পৌঁছাতে পারে এবং ধানগাছ তা শোষণ করতে পারে।

তবে ধানগাছ মাটি বা পানি থেকে কোনো দূষক গ্রহণ করলেই সেটি একই ঘনত্বে চালে পৌঁছাবে—এমন নয়।

গবেষক দলের সদস্য ও আরএল-এর কোয়ালিটি ম্যানেজার হাবিবুল বারী সজীবের মতে, ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষক ধানের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন মাত্রায় জমা হতে পারে। শিকড় ও খড়ে এর ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হতে পারে, যেখানে মানুষের খাওয়ার শস্যদানায় মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।

এই পার্থক্যটি খাদ্যনিরাপত্তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ধানগাছকে বিশ্লেষণ করা এবং সেই ধান থেকে তৈরি মানুষের খাবারকে বিশ্লেষণ করা একই বিষয় নয়।

১০৪টি নমুনা কী বলে?

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পরিসর সীমিত। আট বিভাগের ১৭টি বাজার থেকে সংগৃহীত ১০৪টি নমুনা বাংলাদেশের প্রতিটি বাজার, প্রতিটি ধানের জাত, প্রতিটি উৎপাদন অঞ্চল কিংবা বছরের প্রতিটি মৌসুমের প্রতিনিধিত্ব করে না।

গবেষকেরাও এটিকে পাইলট গবেষণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক peer-reviewed গবেষণাপত্রে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকায় আপাতত নমুনাভিত্তিক বিস্তারিত মাত্রাও প্রকাশ করা হচ্ছে না।

তাই এই গবেষণা থেকে ‘বাংলাদেশের চাল দূষিত’—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক হবে না, তেমনি আর্সেনিকের উপস্থিতিকে উপেক্ষা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়।

বরং ফলাফলটি আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।

ঝুঁকি শুধু একটি সংখ্যায় মাপা যায় না

কোনো খাদ্যে দূষকের মাত্রা মূল্যায়নের সময় শুধু পরীক্ষার ফলই যথেষ্ট নয়। একজন মানুষ দিনে কতটা চাল খান, কত বছর ধরে খান, তাঁর শরীরের ওজন কত এবং পানি ও অন্যান্য খাবার থেকে একই দূষকের সংস্পর্শ কতটা হচ্ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসে।

গবেষণায় ব্যবহৃত Target Hazard Quotient, Hazard Index এবং Target Cancer Risk-এর মতো সূচকগুলো মূলত ঝুঁকি স্ক্রিনিংয়ের সরঞ্জাম। এগুলোর কোনো মান নির্দিষ্ট সীমার ওপরে গেলেই কোনো ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হবেন বা ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন—এমন সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানসম্মত নয়।

বাংলাদেশে মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য-নিরাপত্তা মূল্যায়নে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

ভাত বন্ধ করার প্রশ্ন নয়

এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের ভাত খাওয়া বন্ধ করা বা অযথা কমিয়ে দেওয়ার কারণ নেই বলে গবেষকেরা মনে করেন।

কারণ অধিকাংশ নমুনায় অজৈব আর্সেনিক নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল এবং ক্যাডমিয়াম, সীসা ও পরীক্ষিত বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশও অনুমোদিত মাত্রার নিচে পাওয়া গেছে।

তবে ‘আতঙ্কের কারণ নেই’ মানেই ‘কোনো সমস্যা নেই’ নয়।

গবেষকদের পরবর্তী অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আরও বড় জাতীয় জরিপ, অঞ্চল ও মৌসুমভিত্তিক নমুনা সংগ্রহ, নিয়মিত বাজার নজরদারি এবং তুলনামূলক বেশি আর্সেনিক পাওয়া চালের উৎস শনাক্ত করা। একই সঙ্গে কম আর্সেনিক গ্রহণকারী ধানের জাত, নিরাপদ সেচব্যবস্থা এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন।

চালের নিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ

চালের ক্ষেত্রে আরেকটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হলো—শুধু দূষণ নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কতটা পুষ্টি হারিয়ে যাচ্ছে।

ধানের শস্যকণায় হাস্ক, ব্রান, এন্ডোস্পার্ম ও জার্ম—বিভিন্ন স্তর রয়েছে। বাইরের অংশগুলোতে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। অতিরিক্ত পলিশিংয়ের ফলে এসব পুষ্টি উপাদানের একটি অংশ কমে যেতে পারে, যখন প্রধানত স্টার্চসমৃদ্ধ অংশটি থেকে যায়।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণেও পলিশিং বাড়ার সঙ্গে প্রোটিন, ফ্যাট ও বিভিন্ন ভিটামিন-খনিজের পরিমাণ কমার প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে চালের ‘নিরাপদতা’ এবং ‘পুষ্টিমান’—দুটি প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা হলেও খাদ্যনীতিতে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান যা এখনো জানে না

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়তো ১৯টি নমুনায় সীমার বেশি আর্সেনিক পাওয়া নয়; বরং সেই ফলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

একটি সীমিত নমুনা সতর্ক সংকেত দিতে পারে। কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর তথ্যভান্ডার।

হাবিবুল বারী সজীবের বক্তব্যও সেই দিকেই—আতঙ্ক বা গুজব নয়, প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং কার্যকর নজরদারি।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি ‘ভাত খাব কি খাব না’ নয়। বরং আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো: কোন এলাকায়, কোন ধানের জাতের, কোন মৌসুমের এবং কোন উৎসের চালে দূষকের মাত্রা কত?

সেই প্রশ্নের উত্তর যত বেশি নির্ভুলভাবে জানা যাবে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সিদ্ধান্তও তত বেশি বিজ্ঞানভিত্তিক হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

গবেষণা Vision: বাংলা ভাষায় গবেষণা, ডেটা জার্নালিজম, জননীতি বিশ্লেষণ এবং জনবুদ্ধিমত্তা (Public Intelligence)-এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য Media-Based Think Tank হওয়া; যা সরকার, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন অংশীদার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানভান্ডার ও নীতিগত রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: গবেষণা, ডেটা, জরিপ, নীতি বিশ্লেষণ, প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং বহুমাত্রিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান উৎপাদন করা; যাতে জটিল জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বোঝা যায় এবং তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা যায়।