প্যানিক অ্যাটাক থেকে বাঁচার উপায় !
প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে, ভীতি ও উদ্বেগের তীব্র অনুভূতি। এটি প্রায়ই ঘটে, যদি কেউ তার জীবনে ঘটছে এমন কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করে অথবা কঠিন বা মানসিক চাপযুক্ত কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।প্যানিক অ্যাটাক নিয়ে সচেতনতা জরুরি কারণ এটি মানুষকে অহেতুক আতঙ্ক থেকে মুক্তি দেয়, হার্ট অ্যাটাকের মতো ভুল ধারণা দূর করে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে সাহায্য করে।
প্যানিক অ্যাটাক কি?
প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে ভীতি ও উদ্বেগের অনুভূতি যা হঠাৎ করেই আমাদের হতবিহ্বল করে দিতে পারে এবং সাধারণত এর সঙ্গে হালকা মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার মতো তীব্র শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক শিশু আতঙ্কঅনুভব করে, যেমন সে মনে করতে পারে খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। এমনকি যখন প্রকৃতপক্ষে কোনো বিপদ থাকে না, তখনও এই অনুভূতি হতে পারে।
প্যানিক অ্যাটাকের কারণ কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, প্যানিক অ্যাটাক বা আকস্মিক তীব্র ভীতি কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে হয় না। এটি মূলত জৈবিক, মানসিক এবং পরিবেশগত বিভিন্ন ঝুঁকি ও ট্রিগার এর সমন্বয়ে ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যে প্যানিক অ্যাটাক এবং উদ্বেগজনিত সমস্যার পেছনে যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:
মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
-
দীর্ঘস্থায়ী চাপ: কর্মজীবনের চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা বড় ধরনের আর্থিক সমস্যা।
-
জীবনের বড় পরিবর্তন: প্রিয়জনের মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ, নতুন চাকরি বা বাসস্থান পরিবর্তনের মতো কঠিন অভিজ্ঞতা।
-
অতীতের ট্রমা: অতীতে কোনো নির্যাতন, অবহেলা বা ভীতিকর দুর্ঘটনা বা আঘাতমূলক অভিজ্ঞতার স্মৃতি।
শারীরিক ও জৈবিক কারণ
-
বংশগত বা জিনগত প্রভাব: পরিবারে বা রক্তসম্পর্কীয় কারও প্যানিক ডিসঅর্ডার বা অতিরিক্ত উদ্বেগের ইতিহাস থাকা।
-
মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা: মস্তিষ্কের যে অংশগুলো ভয় ও আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোর কার্যপ্রক্রিয়া বা স্নায়বিক সংকেতে সমস্যা।
-
শারীরিক অসুস্থতা: থাইরয়েডের সমস্যা (হাইপারথাইরয়েডিজম), হৃদস্পন্দনের অনিয়মিত গতি বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা।
খাদ্যাভ্যাস ও বদঅভ্যাস
-
উত্তেজক উপাদানের ব্যবহার: অতিরিক্ত ক্যাফিন (কফি বা এনার্জি ড্রিংকস), নিকোটিন বা মাদকের ব্যবহার অথবা এগুলো হঠাৎ ছেড়ে দেওয়ার ফলে শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।
লক্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে প্যানিক অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, এবং অতিরিক্ত ঘাম। ।
-
মৃত্যু বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর সাথে সম্পর্কিত বিস্ফোরণের ভয়
-
চিন্তাভাবনার কারণে মনোযোগ দিতে অক্ষমতা
-
নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করা এবং বাস্তবতা থেকে বঞ্চিত হওয়া
-
পেশী কাঁপুনি বা কাঁপুনি
-
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা (গরম ঝলকানি, ঘাম, ঠান্ডা লাগা)
-
হৃদস্পন্দন
-
শ্বাসকষ্ট
-
দম বন্ধ হওয়ার অনুভূতি
-
মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা
-
হাত, পা, অথবা মুখে ঝিঁঝিঁ পোকা
তৎক্ষণাৎ করণীয়
মনোবিজ্ঞানের মতে প্যানিক অ্যাটাক শুরু হলে ধীরস্থিরে দীর্ঘশ্বাস নেওয়া, বর্তমান মুহূর্তে মনকে যুক্ত রাখা এবং নিজেকে আশ্বস্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি ক্ষণস্থায়ী ও শারীরিক দিক থেকে ক্ষতিকর নয় বলে মনে রাখা প্রয়োজন।যা করতে হবে -
-
নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস: নাক দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে ছাড়ুন। এতে হৃদস্পন্দন ও অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।
-
বাস্তবতার সাথে সংযোগ (৫-৪-৩-২-১ পদ্ধতি): আশেপাশের ৫টি জিনিস দেখুন, ৪টি জিনিস স্পর্শ করুন, ৩টি শব্দ শুনুন, ২টি গন্ধ নিন এবং ১টি স্বাদ গ্রহণ করুন। এতে মনোযোগ ভয় থেকে সরে যায়।
-
নিজেকে বোঝানো: মনে মনে বলুন যে এই অনুভূতিটি সাময়িক এবং এটি কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই চলে যাবে।
দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ
-
কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT): চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সিবিটি থেরাপি নিলে ভীতিকর চিন্তাভাবনাগুলোকে পরিবর্তন করা সহজ হয়।
-
জীবনযাত্রার পরিবর্তন: অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা এনার্জি ড্রিংক বর্জন করা এবং প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম বা ধ্যান করা প্যানিক অ্যাটাকের প্রবণতা কমায়
কখন হাসপাতালে যাবেন
◑প্রথমবার তীব্র বুকব্যথা হলে
◑শ্বাসকষ্ট খুব বেশি হলে
◑অজ্ঞান হয়ে গেলে
◑হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলে
প্যানিক অ্যাটাক অবহেলার ক্ষতিকর দিকসমূহ
-
প্যানিক ডিসঅর্ডার: বারবার অপ্রত্যাশিত আতঙ্কের আক্রমণ হতে থাকে।
-
অ্যাগোরাফোবিয়া: জনাকীর্ণ স্থান বা ঘরের বাইরে যাওয়ার তীব্র ভয় তৈরি হয়।
-
বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন): দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকে গভীর হতাশা ও বিষণ্নতা দেখা দেয়।
-
ভবিষ্যতের ভীতি: আবার কখন অ্যাটাক হবে—এই আশঙ্কায় সারাক্ষণ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকা।
-
পরিহারের আচরণ: যেসব স্থানে বা পরিস্থিতিতে অ্যাটাক হয়েছিল, তা জেনেশুনে এড়িয়ে চলা।
-
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: মানুষের সাথে মেলামেশা কমানো এবং একা থাকতে শুরু করা।
-
কাজের ক্ষতি: কর্মক্ষেত্র বা পড়াশোনায় মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া।
-
নেশার আসক্তি: অতিরিক্ত টেনশন থেকে মুক্তি পেতে অ্যালকোহল বা মাদকের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়া।
-
ঘুমের ব্যাঘাত: রাতে ভালোমতো ঘুমাতে না পারা বা অনিদ্রা রোগ হওয়া।
-
শারীরিক দুর্বলতা: উচ্চ রক্তচাপ, বুক ধড়ফড় ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হওয়া।
প্যানিক অ্যাটাক সম্পর্কে সচেতনতা অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক কমায় এবং সময়মতো চিকিৎসা নিতে সহায়তা করে। সঠিক তথ্য, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization- WHO),
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (National Institute of Mental Health- NIMH),
মায়ো ক্লিনিক (Mayo Clinic),
ইউনিসেফ (UNICEF )
What's Your Reaction?