পোষা প্রাণী কি সত্যিই মানসিক চাপ কমায় নাকি বাড়ায়? যা বলছে গবেষণা
কর্মব্যস্ত ও কঠিন একটি দিন শেষে পোষা প্রাণীর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটালে অনেকেরই মন ভালো হয়ে যায়। তবে গবেষণা বলছে, সব পরিস্থিতিতে পোষা প্রাণীর সঙ্গ মানসিক চাপ কমায় না। বিশেষ করে তীব্র চাপের মুহূর্তে বিড়ালের সঙ্গে মেলামেশা কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির বদলে বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় উঠে আসা চমকপ্রদ তথ্য
মনোবিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ডাচ ও বেলজিয়ামের গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা এ বিষয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছে। ওপেন ইউনিভার্সিটি অব দ্য নেদারল্যান্ডসের গবেষক ড. মাইকেল জানসেন্স ও ড. সান পেটার্সের নেতৃত্বে ১৮৮টি বিড়াল এবং তুলনামূলক কমসংখ্যক কুকুরের মালিকের ওপর পাঁচ দিনব্যাপী এই সমীক্ষা চালানো হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মনের ভাব, মানসিক চাপের মাত্রা এবং পোষা প্রাণীর সঙ্গে তাদের মেলামেশার ধরন একটি অ্যাপের মাধ্যমে দিনে প্রায় ১০ বার ট্র্যাক করা হয়।
গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়—
স্বাভাবিক সময়: সাধারণ বা স্বাভাবিক মেজাজে থাকার সময় কুকুর বা বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটালে মানুষের মন ইতিবাচক ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।
তীব্র মানসিক চাপের সময়: মানুষ যখন প্রচণ্ড মানসিক উদ্বেগে থাকে, তখন পোষা প্রাণীর উপস্থিতি সেই চাপ কমাতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
বিড়ালের ক্ষেত্রে বিপরীত প্রতিক্রিয়া: কুকুরের উপস্থিতিতে মানসিক চাপে বিশেষ পরিবর্তন না হলেও, বিড়ালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ব্যতিক্রমী চিত্র। তীব্র চাপের মুহূর্তে বিড়ালকে আদর বা মেলামেশার চেষ্টা করা হলে মালিকের বিরক্তি ও নেতিবাচক অনুভূতি কমার বদলে উল্টো বেড়ে গেছে।
কেন এমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া?
বিজ্ঞানীদের মতে, কুকুর ও বিড়ালের আচরণগত পার্থক্য এবং তাদের বিবর্তনের ইতিহাসই মূলত এর প্রধান কারণ।
নিষ্ক্রিয় আচরণ ও বিষণ্নতা: বিড়ালের সঙ্গে কাটানো সময় সাধারণত কিছুটা শান্ত প্রকৃতির হয়। মানসিক চাপের সময় বিড়ালের এই নিষ্ক্রিয়তা মালিককে নিজের সমস্যার কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে পারে।
উদাসীন স্বভাব: হাঙ্গেরির এওটভোস লোরান্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক দুঃসময়ে মানুষকে সান্ত্বনা দিতে বা সাহায্য করতে কুকুর যতটা আগ্রহী, বিড়ালের স্বভাব ততটাই উদাসীন। স্বভাবগতভাবেই বিড়াল স্বাবলম্বী এবং মানুষ তাদের পুরোপুরি বশ মানাতে পারেনি।
শারীরিক ভাষা বুঝতে ভুল করা: বেশিরভাগ মানুষ বিড়ালের অপছন্দ বা শারীরিক ভাষা ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। নিজের মন খারাপের সময় জোর করে বিড়ালকে আদর করতে গেলে তারা বিরক্ত হয়, ফোঁস করে ওঠে বা থাবা মারে—যা মালিকের মানসিক চাপ ও বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রকৃত সত্য ও শিক্ষণীয় দিক
গবেষকেরা অবশ্য উল্লেখ করেছেন, এই সমীক্ষায় বিড়াল পালকের সংখ্যা ছিল বেশি এবং নেতিবাচক অনুভূতি বাড়ার হারটিও বেশ ছোট। তাই এই ফলাফলকে সব পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলা যাবে না।
বাস্তবতা হলো, পোষা প্রাণী কোনো অলৌকিক উপায় নয় যে মুহূর্তেই অফিসের কঠিন জটিলতা বা জীবনের বড় চাপ দূর করে দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তারা মানুষের একাকীত্ব কমাতে এবং মানসিক সঙ্গ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই কোনো খারাপ দিনে প্রিয় বিড়ালটি যদি আপনার কোলে না এসে দূরে সরে থাকে, তাকে জোর না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তার আচরণ ও সংকেতকে সম্মান করে কিছুটা সময় দেওয়াই ভালো। দিনশেষে বিড়ালের এই স্বাধীন ও আপনভোলা স্বভাবই তাদের অনন্য করে তোলে।
পোষা প্রাণী মানুষের জীবনে আনন্দ ও সঙ্গের বড় উৎস হলেও, মানসিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও প্রাণীর আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু আদর নয়, পোষা প্রাণীর স্বভাব ও শারীরিক ভাষা বুঝে তাদের সঙ্গে সময় কাটানোই হতে পারে সম্পর্ক সুন্দর রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়।
What's Your Reaction?