নালা থেকে বাঁধ—সবখানেই পানি: নতুন বন্যা-ঝুঁকিতে পাকিস্তান
কয়েক ঘণ্টার মুষলধারে বৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দিতে। সড়ক ডুবেছে, মানুষ ঘরে আটকা পড়েছে, স্কুল বন্ধ হয়েছে এবং বিপজ্জনক পানি বাড়তে থাকায় শুরু হয়েছে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এবং পাশের শহর রাওয়ালপিন্ডি মঙ্গলবার সকালে জেগে ওঠে এক নতুন বাস্তবতায়।
চারপাশে পানি।
মুষলধারে বৃষ্টির পর নিচু এলাকার সড়ক, আবাসিক অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও গাড়ি আটকা পড়েছে, কোথাও মানুষ ঘরের ভেতরে আটকে পড়েছেন। শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত ব্যাহত হতে শুরু করলে প্রশাসন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে এবং বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানায়।
একটি শহর ডুবে গেলে সেটি শুধু আবহাওয়ার খবর থাকে না। এটি হয়ে ওঠে অবকাঠামো, নগর পরিকল্পনা এবং জলবায়ু ঝুঁকির পরীক্ষা।
পানি বাড়ছে, শুরু হয়েছে সরিয়ে নেওয়া
পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, লেহ নুল্লা খালের পানি দ্রুত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কাটারিয়ান এলাকায় পানির উচ্চতা উঠেছে প্রায় ২৯ ফুটে। গাওয়ালমান্ডিতে তা পৌঁছেছে ২৩ দশমিক ৫ ফুটে।
খালটির অববাহিকায় প্রায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টির পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।
এরপর কাটারিয়ান ও গাওয়ালমান্ডি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়।
স্থানীয় উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২ জানিয়েছে, দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৬০ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি।
বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ঘরের ভেতরে আটকা পড়েছেন এবং উদ্ধারকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
কোথাও ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি
একই শহরের মধ্যে বৃষ্টির মাত্রার পার্থক্যও ছিল বড়।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সাইদপুরে হয়েছে ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টি। গোলরায় ১৫৭ মিলিমিটার। এইচ-৮/২ এলাকায় প্রায় ১৫৫ মিলিমিটার। নিউ কাটারিয়ানে ১৮৬ মিলিমিটার। আর শামসাবাদে বৃষ্টির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ২০০ মিলিমিটার।
এই পরিমাণ বৃষ্টি শুধু সড়কে পানি জমার সমস্যা তৈরি করে না। নগর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, নালা এবং বাঁধ—সবকিছুর ওপর একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করে। ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে মঙ্গলবার সেটিই ঘটতে দেখা গেছে।
রাওয়াল বাঁধের পানি সীমা ছাড়িয়েছে
বৃষ্টির কারণে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাওয়াল বাঁধকে ঘিরে। ইসলামাবাদের ডেপুটি কমিশনার ইরফান নওয়াজ মেমন জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টির কারণে বাঁধের পানির উচ্চতা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। এ কারণে দুপুর ২টায় বাঁধের স্পিলওয়ে খুলে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রশাসন নাগরিকদের নালা, খাল এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ শহরে জমে থাকা পানি যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে দ্রুতগতির পানির প্রবাহ।
বিশেষ করে নিচু এলাকা ও জলপথের আশপাশে।
থেমে গেছে শহরের গতি
ভারী বৃষ্টির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে সড়কে। ইসলামাবাদের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কোথাও গাড়ির গতি কমে গেছে, কোথাও সড়কে জমে থাকা পানির কারণে যানবাহন আটকা পড়েছে। ইসলামাবাদ এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, কিছু গাড়ি পানিতে প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত ডুবে আছে। ট্রাফিক পুলিশ চালকদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
সঙ্গে দেওয়া হয়েছে আরও কয়েকটি সতর্কতা—গাড়ির গতি কমানো, অন্য যানবাহনের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং দৃষ্টিসীমা কমে গেলে সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারিত লেন ধরে চলা। শহরের জন্য এগুলো সাধারণ বৃষ্টির দিনের নির্দেশনা হতে পারে। কিন্তু মঙ্গলবারের পরিস্থিতি ছিল সাধারণের বাইরে।
স্কুল বন্ধ, মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান
রাওয়ালপিন্ডি জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। যখন নগর বন্যার ঝুঁকি বাড়ে, তখন প্রশাসনের প্রথম কাজ শুধু পানি সরানো নয়। মানুষকে পানির পথ থেকে সরিয়ে নেওয়াও।
কারণ শহরের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত অনেক সময় বৃষ্টির সময় নয়। বরং বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর, যখন পাহাড়ি ঢল, খাল ও বাঁধের অতিরিক্ত পানি একসঙ্গে শহরের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
আরও বৃষ্টি আসছে
এই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বৃষ্টি এখনও শেষ হয়ে যায়নি। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের উত্তরাঞ্চলে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
সতর্ক করা হয়েছিল ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিসহ মারদান, সোয়াবি, গুজরানওয়ালা, গুজরাট, শিয়ালকোট এবং লাহোরের নিচু এলাকাগুলোতে নগর বন্যার ঝুঁকির বিষয়ে। অর্থাৎ, মঙ্গলবারের বৃষ্টি হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আরও বড় একটি আবহাওয়াগত ব্যবস্থার অংশ হতে পারে।
একটি শহরের প্রশ্ন
ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির মঙ্গলবারের দৃশ্য দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত নগরায়নশীল শহরগুলোর জন্য একটি পরিচিত সতর্কবার্তা।
শহর যত বড় হয়, পানি যাওয়ার জায়গা তত কমে যায়। কংক্রিট বাড়ে। খাল সংকুচিত হয়। নালা ভরাট হয়। আর কয়েক ঘণ্টার অতিবৃষ্টি তখন একটি পুরো শহরের স্বাভাবিক জীবন থামিয়ে দিতে পারে। মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাজধানী অঞ্চলে সেই বাস্তবতাই দেখা গেছে।
স্কুল বন্ধ হয়েছে। মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সড়ক পানির নিচে। বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার প্রস্তুতি। এবং সামনে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস। প্রশ্ন এখন শুধু—আজ কতটা পানি নামল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—আগামী বৃষ্টি এলে শহরগুলো কি তার জন্য প্রস্তুত?
What's Your Reaction?