ডার্ক ম্যাটারের খোঁজে মিলল নতুন সংকেত

Sep 9, 2026 - 18:46
Sep 9, 2026 - 18:47
 0  12
ডার্ক ম্যাটারের খোঁজে মিলল নতুন সংকেত

মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি ডার্ক ম্যাটার। দেখা যায় না, আলো শোষণ বা বিকিরণও করে না। তবু এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন। এবার যুক্তরাষ্ট্রের মাটির প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে থাকা এক গবেষণাগারে ধরা পড়েছে এমন একটি বিরল সংকেত, যা ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য কণার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এটিকে এখনই ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ বলা যাচ্ছে না।

ডার্ক ম্যাটার কী

ডার্ক ম্যাটারকে অনেকটা মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর মহাকর্ষীয় প্রভাব গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্যালাক্সির ঘূর্ণন ও মহাকর্ষীয় লেন্সিংসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝেছেন, মহাবিশ্বে বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য পদার্থ রয়েছে। তবে সেটি আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা এখনো অজানা।

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা সাধারণ পদার্থের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খুঁজছেন। অনেকটা দেয়ালে ছায়া দেখে সামনে কোনো বস্তু থাকার ধারণা পাওয়ার মতোই, সাধারণ কণার সঙ্গে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংঘর্ষের চিহ্ন খুঁজছেন তাঁরা।

ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম হলো উইম্প। এর পূর্ণ নাম ‘উইকলি ইন্টারঅ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিকেল’। ধারণা করা হয়, এই কণাগুলো তুলনামূলক ভারী হলেও সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে।

এ কারণেই ডার্ক ম্যাটারের কণা শনাক্ত করা এত কঠিন। খুবই বিরল কোনো মুহূর্তে একটি উইম্প সাধারণ কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা মূলত সেই বিরল ঘটনাই ধরার চেষ্টা করছেন।

মাটির গভীরে কেন বসানো হয়েছে ডিটেক্টর

এই কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে লাক্স-জেপেলিন বা এলজেড ডিটেক্টর। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার স্যানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে মাটির প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ফুট নিচে একটি পুরোনো স্বর্ণখনির ভেতর স্থাপন করা হয়েছে। ডিটেক্টরের মূল অংশে রয়েছে প্রায় ১০ টন অতি বিশুদ্ধ তরল জেনন।

কোনো কণা জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে সেখানে ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কিছু ইলেকট্রনও বেরিয়ে আসে, যা আরেকটি আলোর সংকেত তৈরি করে। এই সংকেত বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, সেখানে কী ধরনের কণার সংঘর্ষ ঘটেছে।

তবে সমস্যা হলো, সূর্য ও অন্যান্য মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা গামা রশ্মি ও নিউট্রনের মতো কণাও একই ধরনের সংকেত তৈরি করতে পারে। তাই ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেত আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন।

মাটির এত গভীরে ডিটেক্টর স্থাপনের অন্যতম কারণও এটি। ওপরের বিশাল পাথরের স্তর মহাকাশ থেকে আসা অনেক ধরনের বিকিরণ আটকে দেয়। পাশাপাশি ডিটেক্টরের চারপাশে রয়েছে একাধিক স্তরের সুরক্ষা, যাতে বাইরের কণার প্রভাব যতটা সম্ভব কম থাকে।

হঠাৎ মিলল অস্বাভাবিক সংকেত

২০২১ সালের ডিসেম্বরে এলজেডের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা অসংখ্য সংকেত বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৬ জুন পাওয়া একটি ঘটনা ছিল আলাদা।

সেদিন জেননের নিউক্লিয়াসে একটি কণার আঘাতে এমন একটি সংকেত তৈরি হয়, যা পরিচিত সাধারণ কণার মিথস্ক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়নি। দীর্ঘ বিশ্লেষণের পর গবেষকদের ধারণা, এটি কোনো উইম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘটনাটি উইম্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে ওই কণার ভর একটি প্রোটনের ভরের প্রায় ২০০ গুণ বা তারও বেশি হতে পারে। তবে এই ফল এখনো চূড়ান্ত নয়।

এখনো কেন নিশ্চিত নয়

একটি মাত্র ঘটনাকে ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। এলজেডের বিশ্লেষণে এই সংকেতের পরিসংখ্যানগত গুরুত্ব ২.৬-সিগমা। ডার্ক ম্যাটারের মতো বড় কোনো আবিষ্কার নিশ্চিত করতে সাধারণত ৫-সিগমা পর্যায়ের প্রমাণ প্রয়োজন।

অর্থাৎ, সংকেতটি অত্যন্ত কৌতূহল জাগালেও এটি সাধারণ কোনো কণার অস্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়াও হতে পারে। তাই গবেষকেরাও এ বিষয়ে সতর্ক।

ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শুধু উইম্পই নয়, অ্যাক্সিয়নের মতো কাল্পনিক কণাকেও বিবেচনা করা হয়। এমনকি মহাবিশ্বের শুরুর দিকে তৈরি হওয়া আদিম কৃষ্ণগহ্বরও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

সামনে কী

এলজেডে এখনো তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও সংকেত পাওয়া গেলে এবং সেগুলোকে সাধারণ কোনো কণার মিথস্ক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা না গেলে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য কণার পক্ষে প্রমাণ অনেক শক্তিশালী হবে।

ডার্ক ম্যাটারের রহস্য সমাধানের পথ এখনো অনেক দূর। তবে মাটির গভীরে ধরা পড়া এই অস্বাভাবিক সংকেত বিজ্ঞানীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। পরবর্তী তথ্য ও আরও সংকেতই বলে দেবে, এটি সত্যিই ডার্ক ম্যাটারের ইঙ্গিত, নাকি প্রকৃতির আরও একটি অজানা রহস্য।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

গবেষণা Vision: বাংলা ভাষায় গবেষণা, ডেটা জার্নালিজম, জননীতি বিশ্লেষণ এবং জনবুদ্ধিমত্তা (Public Intelligence)-এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য Media-Based Think Tank হওয়া; যা সরকার, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন অংশীদার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানভান্ডার ও নীতিগত রেফারেন্স প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: গবেষণা, ডেটা, জরিপ, নীতি বিশ্লেষণ, প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং বহুমাত্রিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান উৎপাদন করা; যাতে জটিল জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বোঝা যায় এবং তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা যায়।