ডাকসু নির্বাচনে দ্রুত তফশিল ঘোষণার দাবি ছাত্রসংগঠনগুলোর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়ায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ডাকসু নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ছাত্রসংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে ক্যাম্পাসে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
দীর্ঘ ২৮ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালে ঐ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নির্বাচন হয়নি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিজয়ী নেতারা ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর ডাকসুর মেয়াদ কার্যকর থাকে। সেই হিসেবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে এখনো পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হয়নি। এমনকি নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ডাকসু নেতারা সর্বোচ্চ ৯০ দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এদিকে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন প্রয়োজন। এজন্য দ্রুত নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তারা। গত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলও ডাকসুকে নিয়মিত ও একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ফলে জয়ী হওয়ার পর নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবিটি বাস্তবায়ন তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কখনোই নিয়মিত ধারায় অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৩৮ বার। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে নির্বাচন হয়েছে মাত্র আট বার। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০১৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও তা বন্ধ হয়ে যায়। ছয় বছর পর ২০২৫ সালে পুনরায় ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ডাকসুর ইতিহাসে তপশিল ঘোষণার পরও নির্বাচন ভেস্তে যাওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। ১৯৯১ সালের ১৮ জুন সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও সহিংসতার কারণে নির্বাচন আটকে যায়। এরপর ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০০৫ সালেও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়নি।
নতুন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে গত ২০ আগস্ট প্রথম বৈঠক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বৈঠকে নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া, অংশী-জনদের সঙ্গে আলোচনা এবং হলগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য হল প্রাধ্যক্ষদের প্রতিবেদন দিতে এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ডাকসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়মিত বিষয়। মাঝখানে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় এর ধারাবাহিকতা কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। এবারও নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে হয়তো এক-দুই মাস এদিক-সেদিক হতে পারে। ইতিমধ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে নির্বাচন আয়োজনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। সামনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন ইত্তেফাককে বলেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সব সময় শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ ও লালন করে। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার প্রধান প্ল্যাটফরম ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অতীতের মতোই সব সময় ইতিবাচক।
তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচন কখন হবে সেটা প্রশাসন নির্ধারণ করবে। আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পেরেছি বর্তমান প্রশাসন ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি।
ডাকসুর এজিএস ও ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিউদ্দিন খান বলেন, ছাত্রশিবির সব সময় ডাক-সুর পক্ষে ছিল। আমরা প্রশাসন ও গণমাধ্যমে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করে-ছি, অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন দিতে হবে। আমরা চাই, আগামীকালই নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হোক। নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ফলে যে কোনো সময় নির্বাচন ঘোষণা হলে আ-মরা প্রস্তুত আছি।
জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হাসিব আল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রসভার সংগঠক শিমু আক্তার এবং বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সামি আব্দুল্লাহও অনতিবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করেন।
What's Your Reaction?