চালু হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইলেকট্রিক বিমান
ব্যাটারিতে চলা ছোটখাটো গাড়ি বা বাইকের কথা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু পুরো একটি বিমান যদি শুধু ব্যাটারির শক্তিতে আকাশে উড়ে বেড়ায়, তবে কেমন হয়? ঠিক এমনই এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত জেট বিমান প্রথমবারের মতো সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছে। এটি বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির জগতে একটি বিশাল অর্জন। তবে আপনি যদি ভাবেন, আগামী মাসেই এই বিমানে চড়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন, তাহলে আপনাকে আরেকটু ধৈর্য ধরতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হার্ট অ্যারোস্পেসের তৈরি এই বিমানটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্স১’। আকারে এটি মোটেও ছোট নয়। এর ডানা লম্বায় প্রায় ১০৬ ফুট। লম্বালম্বিভাবে পুরো বিমানের দৈর্ঘ্য ৭৬ ফুট। ওজনও প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড, যা একটি খালি স্কুল বাসের ওজনের সমান! ৩০ আসনবিশিষ্ট এই বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ে। এটি মাটি থেকে ১ হাজার ১০০ ফুট ওপরে উঠে শুধু ব্যাটারির শক্তিতে টানা ২৭ মিনিট উড়েছে। তবে প্রথম পরীক্ষামূলক এই ফ্লাইটে কোনো যাত্রী ছিল না, শুধু একজন পাইলট ছিলেন।
এই সফল পরীক্ষাটি মূলত হার্ট অ্যারোস্পেসের একটি বড় লক্ষ্যের প্রথম ধাপ। তাদের মূল লক্ষ্য ‘ইএস-৩০’ নামে একটি হাইব্রিড-ইলেকট্রিক বিমান তৈরি করা। ২০৩১ সালের মধ্যে এই বিমানটি বাণিজ্যিকভাবে আকাশে উড়বে বলে তারা আশা করছে। ইউনাইটেড, এয়ার কানাডা এবং জেএসএক্সের মতো বড় এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই এই মডেলটির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মূল কারণ, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কম এবং জেটের জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকবে।
হার্ট অ্যারোস্পেসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডার্স ফোরসলান্ড জানিয়েছেন, এক্স১ ফ্লাইটের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানের সমান বড় বৈদ্যুতিক বিমান ওড়ানো সত্যিই সম্ভব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে যে অবিশ্বাস্য উন্নতি হচ্ছে, তাকে কাজে লাগিয়ে হার্ট অ্যারোস্পেসের মতো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আকাশভ্রমণকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তনের দুটি বড় সুবিধা আছে। প্রথমত, পরিবেশের সুরক্ষা। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ২.৫ শতাংশই আসে বিমানের জ্বালানি থেকে। এর বাইরেও বিমান থেকে আরও অনেক ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়। ২০৫০ সালের মধ্যে বিমান চলাচল খাতকে কার্বনমুক্ত করার একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য থাকলেও, বর্তমান জ্বালানি দিয়ে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। ব্যাটারিচালিত বিমান এই নিঃসরণ কমাতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
হার্ট অ্যারোস্পেস দাবি করছে, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমার কারণে তাদের ভবিষ্যৎ ইএস-৩০ বিমান চালানোর খরচ বর্তমানের একই আকারের সাধারণ বিমানের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম হবে। তারা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে—এই পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে বিদ্যুতের বিল এসেছে মাত্র ৫ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৬০০ টাকার মতো! শুনতে অবাক লাগলেও, এই হিসাবটি কেবল বিদ্যুৎ খরচের। এর সঙ্গে পাইলটের বেতন, বিমানবন্দরের চার্জ, ব্যাটারি নষ্ট হওয়া এবং ইনস্যুরেন্সের মতো আরও অনেক খরচ যুক্ত হবে। তাই শেষ পর্যন্ত এয়ারলাইনসগুলো ঠিক কত টাকা বাঁচাতে পারবে এবং যাত্রীরা কত কমে টিকিট পাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সহজ কথায়, সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক বিমান আকাশে ওড়ানো অনেক বড় অর্জন হলেও, যাত্রীরা আপাতত যে বিমানে চড়ার সুযোগ পাবেন, সেটি হবে হাইব্রিড-ইলেকট্রিক বিমান। তবে প্রযুক্তি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে হয়তো অল্প দিনেই কোনো জ্বালানি ছাড়া শুধু ব্যাটারিতে চেপে আমরা আকাশে উড়তে পারব!
What's Your Reaction?