কৃষকরাই প্রকৃত নায়ক
কুশ কুমার কুশল
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। সুজলা, শস্য, শ্যামলা আমাদেরই বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ অফুরন্ত সবুজে ঘেরা অরণ্য। এই সবুজ ভূমিতে কৃষকরা বাস করেন।
ভোরের আলো ফোটার আগে কৃষকরা কোদাল কাঁধে হাতে গামছা মোড়ানো ভাত হাতে নিয়ে মাঠে যান । এদৃশ্য গ্রাম বাঙলার চিরচেনা প্রতিচ্ছবি । এটি তাদের দৈন্দিন জীবনের কর্মসূচী। রোদ, ঝড় ,বৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম কিংবা শীত সব বাধা উপেক্ষা করেও কোনো কিছুতেই তাদের কর্মযজ্ঞ থামান না। ফসল ফলানোর জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সোনালি ফসল ফলান। বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে সারাদিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে হাসি মুখে উড়িয়ে দেন । কৃষকদের নিয়ে কোন প্রচার প্রচারণা নেই কিন্ত তাদের অবদান সবচেয়ে বড়।
কৃষকের জীবন মানেই অনিশ্চত ভবিষ্যত।প্রাকৃতিক দুর্যোগ ,নদী ভাঙ্গন তাদের জীবনে নিত্যসঙ্গী , কখনো বন্যা, কখনো খরা, কখনো অতিবৃষ্টি এমনকি এক রাতের ঝড়ে সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে জেনেও হাল ছাড়েন না কৃষকরা । রাত পোহানের সাথেই কৃষক আবার মাঠে নামেন।দিনের পর দিন , মাসের পর মাস কৃষকরা স্বপ্ন বুনে যান।হার না মানা যোদ্ধার ন্যায় হারার আগে হার নয় এ কথাতেই তারা বিশ্বাসী। তাইতো বারে বারে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে ও ধ্বংস স্তূপে দাঁড়িয়ে বিধ্বংস রুপে ফিরে আসেন কৃষকরা । তাদের এই লড়াই কোনো ক্যামেরার সামনে নয়, কোনো মঞ্চে নয় কিংবা কোন নাটক সিনেমার অভিনয় নয় এই লড়াই চলে নীরবে নিঃশব্দে শুধু একটি জাতিকে বাচিঁয়ে রাখার জন্য। এমন অদম্য সাহসিকতা কৃষকদের সত্যিকারের নায়ক করে তোলে।
কৃষকরা অর্থনীতির মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষকদের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান কৃষির সঙ্গে জড়িত।কৃষকরা দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের মূল চালিকাশক্তি। কৃষকরা শুধু নিজের রুটি রুযীর কিংবা পরিবারের জন্য নয় তারা সমগ্র দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ । নিজেরা শত অভাব কষ্টে থেকেও দেশের কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেন। বাংলাদেশের প্রতিটি খাবারের প্লেটে কৃষকের শত কষ্ট ও ঘাম ঝরানোর গল্প লুকিয়ে আছে । ইট পাথরের নগরীর রাতের শহরের ঝলমলে আলো, ব্যস্ত রেস্তোরাঁ কিংবা বন্ধুদের আড্ডা ,বিয়ে বাড়ীর উৎসবের ভোজ সবখানেই গ্রামবাংলার কৃষির ছোঁয়া লেগে আছে।
কৃষকরা খাদ্য নিরাপত্তার অদৃশ্য পাহারাদার । দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কৃষকদের কাঁধে। ।কৃষকই এদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভরসা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত একটি প্রধান স্তম্ভ। মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক সংকট কিংবা আমদানি নির্ভরতার ভয়কে তোয়াক্কা না করে সবকিছুর মাঝেও কৃষকরাই দেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর রেখছেন। তার বাস্তব উদাহরণ করোনাকালীন সময়ে খাদ্যর যোগান দিয়েছিল কৃষকরা । শুধু এখানে শেষ নয় দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটে বিপদের বন্ধু হয়েছিল কৃষকরা। তাদের গুরুত্ব অপরিসীম ।তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়—কৃষকরাই বাংলার প্রকৃত নায়ক।
গ্রামের জীবন ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক কৃষক। গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতিহ্য সবকিছুর সঙ্গে কৃষকের জীবন ও কাজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পৌষ মাসে নতুন ধানের নবান্নের পিঠা পুলি, বৈশাখের রঙ, গ্রামবাংলার উৎসব—সবকিছুর প্রাণ কৃষক। বাংলার সংস্কৃতির শিকড় কৃষকদের হাত ধরেই। কৃষকদের হাত ধরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে আছে বাংলার ঐতিহ্য। কৃষক ছাড়া গ্রাম অস্তিত্বহীন জীবন, প্রাণ নয়।
নায়ক মানে কি শুধু মঞ্চে কিংবা টিভি সিনেমার পর্দার অভিনয় শিল্পীদের কে বুঝায় । নায়ক মানেই কি আলো, মাইক আর করতালি? কৃষক লাঙল দিয়ে দেশ গড়ে, ঘাম দিয়ে বাংলার গোটা জাতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে —তারা কি নায়ক নয়? কৃষক অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন না, কিন্তু অনাহারের বিরুদ্ধে প্রতিদিন যুদ্ধ করেন।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজে কৃষকদের অবদান আমরা এখনো যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারি নি । তারা আলোচনার কেন্দ্রে খুব কমই আসেন। কৃষির্নিভর দেশে ভুলে গেলে চলবে না কৃষকদের ছাড়া আমাদের জীবন অচল, তাদের ছাড়া একদিনও চলতে পারি না। যে জাতি তার কৃষককে সম্মান দিতে পারে না, সে জাতি টেকসই উন্নয়নও অর্জন করতে পারে না।
কৃষি একটি পেশার নাম নয়,বাংলার অস্তিত্বের ঠিকানা ।তাই তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তাদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য । সম্মানই হোক প্রকৃত স্বীকৃতি। যারা অস্ত্র নয়, লাঙল আর ঘাম দিয়ে দেশ গড়ার সেবায় নিয়োজিত থাকে তারাই প্রকৃত নায়ক।
লেখা:
কুশ কুমার কুশল
শিক্ষার্থী ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
What's Your Reaction?