হাবলের নতুন ছবিতে ধরা পড়ল মহাজাগতিক ‘সুপারবাবল’
মহাকাশের বিশাল এক নীহারিকার কেন্দ্রে থাকা রহস্যময় গহ্বরের নতুন ছবি প্রকাশ করেছে নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। ২০২৬ সালের নতুন পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে ‘সুপারবাবল’ নামে পরিচিত এক বিশাল শূন্যস্থান, যার বিস্তৃতি প্রায় ২১০ বাই ১৪০ আলোকবর্ষ।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বাতাস ও সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রভাবে তৈরি হয়েছে এই মহাজাগতিক গহ্বর।
মহাকাশ গবেষকদের দীর্ঘদিনের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মিল্কিওয়ে ছায়াপথের নিকটবর্তী প্রতিবেশী ‘লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড’ বা এলএমসি। পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই ছোট ছায়াপথটি মিল্কিওয়ের চারপাশে ঘুরছে। নতুন পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে হাবল এবার এলএমসির ভেতরে থাকা একটি নীহারিকার আরও বিস্তারিত ছবি ধারণ করেছে।
হাবল টেলিস্কোপের তোলা এ ছবিতে দৃশ্যমান নীহারিকাটির নাম ‘এলএইচএ ১২০-এন৪৪’, সংক্ষেপে ‘এন৪৪’। দক্ষিণ আকাশের ডোরাডো তারামণ্ডলে অবস্থিত এ নীহারিকাটি এমন একটি সক্রিয় অঞ্চল, যেখানে এখনও নতুন নতুন তারা জন্ম নিচ্ছে।
তবে এ নীহারিকার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য এর কেন্দ্রের বিশাল গহ্বর। বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘সুপারবাবল’ বলছেন। নাসার তথ্য অনুযায়ী, গহ্বরটি প্রায় ২১০ বাই ১৪০ আলোকবর্ষ চওড়া। অর্থাৎ এর আকার মানুষের কল্পনারও অনেক বাইরে। এক আলোকবর্ষ হলো আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, যা প্রায় ৯ লাখ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার।
কেন তৈরি হয়েছে এই সুপারবাবল
মহাকাশের এই বিশাল সুপারবাবল বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহের বিষয়। তবে এর তৈরির পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, নীহারিকার কেন্দ্রে থাকা বড় ও উজ্জ্বল তারাগুলো থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী নাক্ষত্রিক বাতাস বের হয়েছে। একই সঙ্গে এসব তারার কিছু সুপারনোভা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ধ্বংস হয়েছে। এই শক্তিশালী বাতাস ও বিস্ফোরণের প্রভাবে আশপাশের গ্যাস সরে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল ফাঁকা অঞ্চল।
এরপর সরিয়ে দেওয়া গ্যাস চারপাশে জমে তৈরি করেছে ঘন ও ধুলোময় একটি খোলস। আর সেই খোলসের বিভিন্ন অংশে এখনও নতুন তারা তৈরি হচ্ছে। ফলে একই অঞ্চলে তারার জন্ম এবং পুরোনো তারার বিস্ফোরণের প্রভাব—দুই ধরনের প্রক্রিয়াই দেখা যাচ্ছে। এ কারণেই N44 নীহারিকা তারার জন্ম ও বিবর্তন বোঝার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এ নীহারিকার আরেকটি দারুণ দিক হলো, এটি একটি ‘ইমিশন নেবুলা’ বা নিঃসরণ নীহারিকা। সহজ করে বললে, আশপাশের বড় তারাগুলোর অতিবেগুনি বিকিরণে নীহারিকার গ্যাস শক্তি পেয়ে আয়নিত হয়। পরে সেই গ্যাসের কণাগুলো শক্তি হারিয়ে নিচু শক্তিস্তরে ফিরে আসার সময় আলো নির্গত করে। এ কারণেই নীহারিকাটি এত উজ্জ্বল ও বর্ণিল দেখায়।
হাবল দিয়ে N44 নিয়ে গবেষণার অন্যতম কারণ হলো, এই অঞ্চল তারার জন্মের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে হাবল প্রায় পাঁচ লাখ তারা শনাক্ত ও তালিকাভুক্ত করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার তারা রয়েছে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, যেগুলো এখনও তাদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরির পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু করেনি।
N44 অবশ্য বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন কোনো নীহারিকা নয়। এর বিভিন্ন অংশ নিয়ে এর আগেও হাবলসহ অন্যান্য টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণ হয়েছে। এমনকি N44-এর ভেতরের ছোট একটি বুদ্বুদ, ‘N44F’, নিয়েও আগে হাবলের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের নতুন পর্যবেক্ষণে N44-এর বিস্তৃত অঞ্চল এবং এর কেন্দ্রের বিশাল ‘সুপারবাবল’কে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই নতুন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধু মহাজাগতিক একটি চমৎকার দৃশ্যই দেখছেন না বরং নক্ষত্র কীভাবে জন্ম নেয়, বড় তারার শক্তিশালী বাতাস কীভাবে আশপাশের গ্যাসকে পরিবর্তন করে এবং এসব প্রক্রিয়া কীভাবে নতুন তারার জন্মকে প্রভাবিত করে—সেসব বিষয়ও আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ পাচ্ছেন।
হাবলের ২০২৬ সালের নতুন পর্যবেক্ষণে N44 এর বিশাল ‘সুপারবাবল’ আবারও মহাকাশের এক বিস্ময়কর দৃশ্য সামনে এনেছে। একই সঙ্গে এটি তারার জন্ম ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য দিচ্ছে।
সূত্র :NASA
What's Your Reaction?