নারীদের মাদকাসক্তি বাড়ছে

Aug 21, 2026 - 00:00
 0  9
নারীদের মাদকাসক্তি বাড়ছে

দেশে নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ইয়াবা, গাঁজা ও ই-সিগারেটের পাশাপাশি মদ্যপানেও ঝুঁকছেন অনেক তরুণী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, অসৎ সঙ্গ ও কাছের মানুষের প্ররোচনাই এর অন্যতম কারণ।

বিশেষ করে রাজধানীতে বসবাসকারী নারীদের অনেকে গাঁজা, ইয়াবা এবং ইলেকট্রিক সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এছাড়া বিপথগামী তরুণীদের কেউ কেউ রীতিমতো বারে গিয়ে নিয়মিত মদ পান করছেন। চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স চেয়ে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের মাদকাসক্তি পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের। কারণ নারী গর্ভধারণ করেন। ফলে মাদকাসক্তির প্রভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা বিকলঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে। এছাড়া নারীদের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ বেশ কম। সামাজিক কারণেও নারীদের অনেকে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে রাজি হন না।

নারকোটিক্সের সম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সাধারণত ছিন্নমূল এবং হতদরিদ্র নারীদের একটি বড় অংশ সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হন। উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত নারীদের বেশির ভাগই ভর্তি হন বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে।

বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নারী মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন। এদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবা আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দুজন ব্যবসায়ী, একজন

বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার।

সম্প্রতি সেখানে গেলে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী যুগান্তরের কাছে তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ধনাঢ্য পরিবারে তার জন্ম। কিন্তু দাম্পত্য বিরোধে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয়। এর পরের বছরই তিনি সন্তান জন্ম দেন। তবে ৩ গুণ বেশি বয়সি স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে জীবনের প্রতি এক ধরনের হতাশা থেকে তিনি

ধীরে ধীরে মাদকের দিকে হাত বাড়ান।

সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেই দেখেছেন স্কুল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ইয়াবা। পাড়া-মহল্লায় অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ছেড়ে নতুন বাজার এলাকায় সান ফ্লাওয়ার নামের একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অনেককেই তিনি ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্ত তরুণীদের একটি বড় অংশ ইয়াবা এবং গাঁজাসেবী। বিশেষ করে ইয়াবা সেবন নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যবান কিংবা মোটা তরুণীদের অনেকে চিকন বা পাতলা হওয়ার জন্য ইয়াবা সেবন করে থাকেন। অথচ বাস্তবে ইয়াবা আসক্তির ফলে ক্ষুধামন্দা থেকে সাময়িক ওজন হ্রাস পেলেও দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ্যত্বসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়।

মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ সময় টানা কয়েক মাস ধরে তাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তিনি ব্যথানাশকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, ঘটনাক্রমে মাদকের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হলেও বাস্তবে চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কেউবা পদোন্নতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ে কিংবা হতাশা থেকেও মাদক নিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ সাময়িকভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন।

ইয়াবা ছাড়াও সম্প্রতি তরুণীদের অনেককে বারে গিয়ে মদ পান করতে দেখা যায়। চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকশ পারমিট হস্তান্তরের অপেক্ষায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে।

নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও এবং উত্তরা এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও এবং রমনা এলাকা থেকেও নারীদের অনেকে মদ পানের পারমিটের আবেদন করেছেন। তবে এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মদের বারে পেশাদার ‘বার গার্ল’ হিসাবে কাজ করেন।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে মুসলিমদের মদ পানের লাইসেন্স প্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কিছু রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকরা অনেক সময় সীমিত অ্যালকোহল পানের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আইনের এমন ফাঁক কাজে লাগিয়ে মদ পানের পারমিট নিচ্ছেন অনেকেই। এছাড়া নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেন নারকোটিক্সের কতিপয় অসাধু সদস্য। এমনকি ভুয়া কিংবা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করেও প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পারমিট ইস্যু করা হয়ে থাকে।

নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের ক্রমশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা যে কোনো সমাজের জন্য উদ্বেগের। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা মূলত অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীর দ্বারা মাদক গ্রহণে প্ররোচিত হন। এছাড়া কোনো পরিবারে যদি বাবা অথবা বড় ভাই সিগারেট কিংবা অ্যালকোহল পান করেন তাহলে নারী পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের অন্যরাও এতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরামর্শক আঞ্জুমান আরা যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও মাদক সেবনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মদ এবং ইয়াবা। এর মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের হার সর্বাধিক। তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছরের কিশোরী থেকে ৪৮ বছর বয়সি নারীরাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন।

নারীদের মাদকাসক্তি ঠেকাতে পরিবার ও সমাজকে আরও সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদকের বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগেও কঠোরতা প্রয়োজন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

লাইফ স্টাইল Vision: বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যকর জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবার, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং জীবনমান সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, গবেষণানির্ভর ও প্রভাবশালী Human Development Platform হওয়া; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ভ্রমণ, পরিবার, ক্যারিয়ার, ফ্যাশন, খাদ্য, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা মানুষকে আরও সচেতন, সুস্থ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।