টেবিল টেনিসের মতোই পরমাণুতেও বাঁক নেয় আলো!
টেবিল টেনিসের বলকে সঠিক স্পিন দিলে যেমন হঠাৎ গতিপথ বদলে বাঁক নেয়, আলোর ক্ষেত্রেও তেমন একটি অদৃশ্য প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এবার প্রথমবারের মতো পরমাণু পর্যায়ে সেই ‘অপটিক্যাল ম্যাগনাস ইফেক্ট’ পরীক্ষায় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষকদের মতে, আলোর এই ক্ষুদ্র স্থানচ্যুতি ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কিউবিট নিয়ন্ত্রণ আরও নিখুঁত করতে কাজে লাগতে পারে। গবেষণাটি ৬ আগস্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক জার্নাল Physical Review Letters এ প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে Paul Scherrer Institute (PSI) ২৭ আগস্ট বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং ScienceDaily ১৩ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশ করে।
টেবিল টেনিসের বলের সঙ্গে মিল কোথায়?
স্পিন দেওয়া টেবিল টেনিস বল বাতাসের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তার গতিপথ বাঁকিয়ে দেয়। এই পরিচিত ঘটনাকে বলা হয় Magnus effect।
তবে পরমাণু পর্যায়ে একই ঘটনা একটু ভিন্নভাবে দেখা গেছে। এখানে কোনো আয়ন বাঁকা পথে ছুটে যায়নি। বরং লেজারের সঙ্গে আয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়ার অবস্থান লেজারের কেন্দ্র থেকে সামান্য এক পাশে সরে গেছে। এই ঘটনাই ‘অপটিক্যাল ম্যাগনাস ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।
এক আয়নকে বানানো হয়েছিল ক্ষুদ্র সেন্সর
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি ক্যালসিয়াম আয়ন ব্যবহার করেন। বিশেষ ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের সাহায্যে আয়নটিকে প্রায় স্থির অবস্থায় আটকে রাখা হয়।
এরপর অত্যন্ত শক্তভাবে ফোকাস করা লেজার রশ্মির বিভিন্ন অংশের মধ্য দিয়ে আয়নটিকে সরিয়ে দেখা হয়, কোন অবস্থানে আলোর সঙ্গে তার মিথস্ক্রিয়া সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।
গবেষকেরা কয়েকশ ন্যানোমিটার পর্যন্ত এই ক্ষুদ্র স্থানচ্যুতি পরিমাপ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ আলোর সঙ্গে আয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া লেজারের একেবারে মাঝখানে না হয়ে সামান্য পাশে ঘটেছে।
কেন সরে যায় মিথস্ক্রিয়ার জায়গা?
লেজারকে খুব শক্তভাবে ফোকাস করলে তার বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের গঠন সাধারণ আলোর রশ্মির মতো থাকে না। এই পরিবর্তিত ক্ষেত্রের কারণেই আয়নের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়ার অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই পাশের দিকে সরে যাওয়ার পরিমাণ লেজার কতটা শক্তভাবে ফোকাস করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং এর আকার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই আবিষ্কার কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ trapped ion বা আটকে রাখা আয়নকে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং লেজারের সাহায্যে এসব কিউবিটের কোয়ান্টাম অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
লেজার ও আয়নের মিথস্ক্রিয়ার এই ক্ষুদ্র পরিবর্তন হিসাবের মধ্যে না থাকলে ভবিষ্যতে কিউবিট নিয়ন্ত্রণে ভুল তৈরি হতে পারে। আবার গবেষকদের মতে, এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কিউবিটগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরির নতুন পদ্ধতিও সম্ভব হতে পারে।
তাত্ত্বিক ধারণা এবার পরীক্ষায় প্রমাণ
অপটিক্যাল ম্যাগনাস ইফেক্টের ধারণা আগে তাত্ত্বিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। এবার Paul Scherrer Institute (PSI), ETH Zurich এবং University of Amsterdam এর গবেষকদের পরীক্ষায় এর সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেল।গবেষণাটির প্রথম লেখক Philip Leindecker।
মূল গবেষণাপত্রের শিরোনাম “Direct Observation of the Optical Magnus Effect with a Trapped Ion”। এটি Physical Review Letters, ভলিউম ১৩৭ এ প্রকাশিত হয়েছে।
টেবিল টেনিসের বলের পরিচিত বাঁক এবার পরমাণু ও আলোর ক্ষুদ্র জগতেও ধরা পড়েছে। এই আবিষ্কার শুধু আলোর আচরণ বোঝার ক্ষেত্রেই নতুন তথ্য দিচ্ছে না, ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতেও এর ব্যবহার হতে পারে।
তথ্যসূত্র : ScienceDaily, Paul Scherrer Institute (PSI), Physical Review Letters।
What's Your Reaction?