টিকটকে তান্ত্রিক সেজে প্রতারণায় আটক এক যুবক
কখনো তান্ত্রিক গুরু, কখনো পাগলা মসজিদের খাদেম পরিচয়ে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে টিকটকে পরিচিত এক নারীর কাছ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মো. মিজানুর রহমানকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর কল্যাণপুরে পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুর রহমান।
তিনি জানান, টিকটকে বিভিন্ন আইডি ব্যবহার করে নিজেকে কখনো ‘তান্ত্রিক গুরু জাফর কবিরাজ’, কখনো ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ এবং কখনো কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের খাদেম পরিচয় দিতেন মিজানুর। তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে পারিবারিক অশান্তি দূর করা, দাম্পত্য কলহের সমাধান, ব্যবসায়িক লোকসান কাটানো এবং পছন্দের মানুষকে কাছে পাওয়ার মতো নানা সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখাতেন তিনি।
পিবিআই জানায়, বিভিন্ন তান্ত্রিকের তৈরি ভিডিও ডাউনলোড করে নিজের টিকটক আইডিতে প্রকাশ করতেন মিজানুর। এসব ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। পরে কবিরাজি উপকরণ কেনার কথা বলে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন। টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের অলৌকিক শক্তির ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগী এক নারী (ছদ্মনাম নুসরাত মরিয়ম) টিকটকে ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে মিজানুরের সঙ্গে পরিচিত হন। পারিবারিক সমস্যার সমাধানের আশায় ইমু ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের পর বিভিন্ন সময়ে বিকাশের মাধ্যমে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। পরে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে টাকা ফেরত চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এ ঘটনায় ওই নারী উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন। গত ১০ অক্টোবর পিবিআইয়ের এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ অক্টোবর সকাল ৬টার দিকে জামালপুর সদর থানার চর যথার্থপুর ভাটিপাড়া গ্রাম থেকে মিজানুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুর রহমান বলেন, মিজানুরকে জামালপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসার সময় তার ইমু নম্বরে ৪২ থেকে ৪৩ জন ভুক্তভোগী ফোন করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তার প্রতারণার শিকার মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস ধরে এ ধরনের প্রতারণায় জড়িত মিজানুর। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকশ মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কেউ প্রথমে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, আবার কেউ এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে যোগাযোগ শুরু করতেন। পরে ভুক্তভোগীদের পরিস্থিতি ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাদের কাছ থেকে আরও টাকা আদায় করা হতো।
এই প্রতারণায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান আব্দুর রহমান। তার ভাষ্য, মিজানুর একাই মূল কাজটি করলেও অন্য কেউ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা বা ভিডিও ডাউনলোডের কাজে সহায়তা করে থাকতে পারে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কথিত তান্ত্রিক বা কবিরাজের অলৌকিক সমাধানের আশ্বাসে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
What's Your Reaction?