সৌরপ্যানেলের নিচে চাষাবাদ, নতুন সম্ভাবনা

Oct 9, 2026 - 09:07
Oct 9, 2026 - 09:11
 0  2
সৌরপ্যানেলের নিচে চাষাবাদ, নতুন সম্ভাবনা

একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌরপ্যানেল, অন্যদিকে ফসল ফলানোর জন্য কৃষিজমি,জমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একই জমিতে যদি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ফসলও ফলানো যায়, তাহলে জমির ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে। এই ধারণাকে বাস্তবে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীরা সৌরপ্যানেলের নিচে ফসল চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন।

‘অ্যাগ্রিভোল্টাইকস’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থায় একই জমিতে সৌরপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিকাজ করা হয়। কোথাও প্যানেল উঁচু করে বসানো হয়, যাতে নিচে কৃষিকাজ করা যায়। আবার কোথাও আংশিক স্বচ্ছ বা বিশেষ ধরনের প্যানেল ব্যবহার করে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় আলো পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।

সাম্প্রতি প্রকাশিত নতুন একটি গবেষণায় সুইডেনের পরীক্ষামূলক খামারে বিশেষ ধরনের গোলাপি আভাযুক্ত আধা-স্বচ্ছ সৌরপ্যানেলের নিচে ব্রকলি চাষের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে সেল রিপোর্টস ফিজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে।

ব্রকলি চাষে কী দেখা গেল

গবেষকেরা এমন সৌরপ্যানেল ব্যবহার করেছেন, যেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ফসলের কাছে পৌঁছাতে দেয়। প্যানেলগুলো নীল ও লাল আলোর অংশকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, কারণ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও সালোকসংশ্লেষণে এসব আলোর ভূমিকা রয়েছে।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিশেষ প্যানেলের নিচে জন্মানো ব্রকলি খোলা জায়গায় বেড়ে ওঠা ব্রকলির মতো আকারে পৌঁছাতে পেরেছে। তবে প্যানেলের নিচে থাকা ফসলের পরিপক্ব হতে ২৫ দিন বেশি সময় লেগেছে।

গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, পরীক্ষায় ব্রকলির আলো ব্যবহারের দক্ষতা ৪.৫ গুণ বেড়েছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে ফসলের মোট উৎপাদনও ৪.৫ গুণ বেড়েছে। আলো ব্যবহারের দক্ষতা, ফসলের বৃদ্ধি এবং মোট ফলন আলাদা বিষয়। গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, উপযুক্ত প্যানেলের নকশা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ফসল চাষের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ থাকতে পারে।

জমির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় জায়গা প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও খাদ্যের চাহিদার কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে একই জমি থেকে বিদ্যুৎ ও খাদ্য—দুই ধরনের উৎপাদন সম্ভব হলে জমির ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে।

সৌরপ্যানেলের ছায়া কিছু ক্ষেত্রে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং অতিরিক্ত গরমে ফসলের ওপর তাপের চাপ কমাতে পারে। তবে সব ফসল একইভাবে ছায়া সহ্য করতে পারে না। যেসব ফসল বেশি সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর ফলন প্যানেলের নিচে কমেও যেতে পারে। তাই ফসলের ধরন, প্যানেলের উচ্চতা, দূরত্ব, স্বচ্ছতা ও আলোর প্রবেশের পরিমাণ অনুযায়ী নকশা ঠিক করা জরুরি।

অর্থাৎ, শুধু কৃষিজমিতে সৌরপ্যানেল বসালেই দ্বিগুণ লাভ নিশ্চিত হবে না। জমি ও ফসলের উপযোগিতা যাচাই করে পরিকল্পনা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে কৃষিজমি সীমিত, একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজের সমন্বিত ব্যবস্থা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের ওপর একটি গবেষণায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সৌরসেচ পাম্পের সঙ্গে যুক্ত সৌরপ্যানেলের নিচে বিভিন্ন ফসল চাষের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফলাফল ফসলভেদে আলাদা। শীতকালীন মৌসুমে টমেটো, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো কিছু ফসলের ফলন ছায়ায় কমেছিল। অন্যদিকে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ছায়া সহ্য করতে পারে এমন আদা ও হলুদের ফলন বেড়েছিল।

এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের জন্যও এই পদ্ধতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে ফসল নির্বাচন ও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে প্রযুক্তির সামঞ্জস্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুইডেনে ব্রকলি চাষের পরীক্ষার ফল সরাসরি বাংলাদেশের সব ফসল বা আবহাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না।

কৃষকের লাভ নির্ভর করবে কোন বিষয়গুলোর ওপর

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, প্যানেল বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কত হবে। দ্বিতীয়ত, প্যানেলের নিচে কোন ফসল ভালো হবে এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় কত হতে পারে। তৃতীয়ত, কৃষিযন্ত্র চালানো, সেচ দেওয়া, ফসল তোলা ও প্যানেল পরিষ্কারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে কি না।

প্যানেলের ছায়া, তাপমাত্রা ও মাটির আর্দ্রতার পরিবর্তনও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকের জমির মালিকানা, বিনিয়োগের অর্থ এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা বড় পরিসরে চালুর আগে বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রকল্প, ফসলভিত্তিক গবেষণা এবং খরচ-লাভের হিসাব প্রয়োজন। কৃষক, গবেষক, বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয় থাকলে প্রযুক্তিটি স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত করা সম্ভব।

বিদ্যুৎ ও খাদ্য উৎপাদনে নতুন চিন্তা

সৌরপ্যানেলের নিচে ফসল চাষের ধারণা কৃষিজমি ও জ্বালানি উৎপাদনের মধ্যে সমন্বয়ের একটি সম্ভাব্য পথ দেখাচ্ছে। তবে এটি সব জমি বা সব ফসলের জন্য একইভাবে কার্যকর হবে না। সঠিক নকশা, উপযুক্ত ফসল এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজকে সব সময় আলাদা করে ভাবতে হবে না। পরিকল্পিতভাবে দুই ব্যবস্থার সমন্বয় করা গেলে সীমিত জমি থেকে একাধিক উপকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ভর করবে স্থানীয় পরীক্ষার ফল, বিনিয়োগের খরচ এবং কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

ফিচার Vision: বাংলা ভাষায় গভীর অনুসন্ধান, দীর্ঘ আকারের সাংবাদিকতা, মানবিক গল্প এবং বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনামূলক প্রতিবেদনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিশ্বাসযোগ্য Narrative Journalism Platform হওয়া; যা সময়, সমাজ এবং মানুষের পরিবর্তনের একটি স্থায়ী জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: সমসাময়িক ঘটনা, ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি, ধারণা এবং পরিবর্তনকে গভীর গবেষণা, অনুসন্ধান, সাক্ষাৎকার, তথ্য, ইতিহাস এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে উপস্থাপন করা; যাতে পাঠক কেবল ঘটনা জানতে না পারেন, বরং সেই ঘটনার মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যও উপলব্ধি করতে পারেন।