ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, বাড়ির আশপাশে মশার বংশবিস্তার ঠেকাবেন যেভাবে

Oct 10, 2026 - 09:57
 0  1
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, বাড়ির আশপাশে মশার বংশবিস্তার ঠেকাবেন যেভাবে

বৃষ্টির পর ছাদে জমে থাকা পানি, বারান্দার ফুলের টব কিংবা ঘরের কোণে পড়ে থাকা অব্যবহৃত পাত্র—এসব ছোট জায়গাই হয়ে উঠতে পারে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল। দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে সাময়িকভাবে মশা কমানো সম্ভব হলেও জমে থাকা পানি ও প্রজননস্থল দূর না করলে ঝুঁকি থেকেই যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৪ হাজারের বেশি মানুষ। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩০০ জনের। সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি বাড়ি, ভবন ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।

সপ্তাহে অন্তত এক দিন জমে থাকা পানি পরীক্ষা করুন

এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাড়ির ভেতর ও বাইরে যেসব পাত্রে পানি জমতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ফুলের টবের নিচের ট্রে, পানির বালতি, ড্রাম, ছাদের ট্যাংক, ফেলে রাখা টায়ার, বোতল, ডাবের খোসা ও প্লাস্টিকের পাত্রে পানি জমছে কি না দেখুন। বৃষ্টির পর ছাদ, বারান্দা ও উঠানে বিশেষভাবে নজর দিন। অপ্রয়োজনীয় পাত্র সরিয়ে ফেলুন এবং যেসব পাত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খালি করে ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।

পানির ট্যাংক ও সংরক্ষণপাত্র ঢেকে রাখুন। সপ্তাহে অন্তত একবার সেগুলো খালি করে পরিষ্কার করা এবং নতুন করে পানি জমার সুযোগ বন্ধ করা ভালো। শুধু পানি ফেলে দিলেই সব সময় যথেষ্ট নয়; পাত্রের ভেতরের দেয়ালে লেগে থাকা মশার ডিমও পরিষ্কারের মাধ্যমে সরাতে হবে।

শুধু ফগিং বা স্প্রের ওপর নির্ভর করবেন না

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা মারার ওষুধ বা ফগিং ব্যবহার করা হলেও সেটিকে একমাত্র সমাধান ভাবা ঠিক নয়। এসব পদ্ধতি উড়ন্ত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আশপাশে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা থাকলে সেখান থেকে আবার মশা জন্মাতে পারে।

তাই মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রজননস্থল খুঁজে বের করে ধ্বংস করা। প্রয়োজন হলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের সময় পণ্যের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও পোষা প্রাণীকে নিরাপদে রাখুন। নিজে থেকে পানির ট্যাংক বা পানযোগ্য পানিতে কোনো রাসায়নিক মেশাবেন না।

দিনের বেলাতেও মশা থেকে সুরক্ষিত থাকুন

অনেকে মনে করেন, মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায়। তাই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্তও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বাইরে গেলে হাত-পা যথাসম্ভব ঢাকা পোশাক পরুন। দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করুন। প্রয়োজন হলে নির্দেশনা মেনে ডিইইটি, পিকারিডিন বা আইআর৩৫৩৫ যুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে পণ্যের বয়সসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং চোখ, মুখ বা ক্ষতস্থানে প্রতিরোধক লাগাবেন না।

দিনের বেলায় ঘুমালে মশারি ব্যবহার করুন, বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে। ঘরে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাঁকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি, যাতে সংক্রমিত মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।

ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন ও ড্রেনেও নজর দিন

বাড়ির ভেতর পরিষ্কার রাখলেও আশপাশের জায়গায় পানি জমে থাকলে মশার বংশবিস্তার ঠেকানো কঠিন। ছাদের কোণে, নির্মাণাধীন ভবনের গর্তে, পরিত্যক্ত ভবন বা জমিতে এবং ড্রেনের আশপাশে পানি জমছে কি না দেখুন। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে থাকলে তা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন।

ফেলে দেওয়া বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট, টায়ার ও অন্যান্য আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। বাড়িওয়ালা, ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়মিতভাবে এসব জায়গা পরীক্ষা করা দরকার। নিজের বাসা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি পাশের বাড়ি বা আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন

উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, বমিভাব বা ত্বকে ফুসকুড়ি ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে ডেঙ্গু হয়েছে; প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা দরকার।

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমন নয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ খাবেন না। এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বরের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

প্রতিরোধ শুরু হোক নিজের ঘর থেকেই

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় কোনো আয়োজনের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন কয়েক মিনিট বাড়ি ও আশপাশ পরীক্ষা করা, সপ্তাহে এক দিন পানি জমার জায়গাগুলো পরিষ্কার করা এবং দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

তবে দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়। বাড়ির মালিক, ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, দ্রুত প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লক্ষণ দেখা দিলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

লাইফ স্টাইল Vision: বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যকর জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবার, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এবং জীবনমান সম্পর্কিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, গবেষণানির্ভর ও প্রভাবশালী Human Development Platform হওয়া; যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জীবনমান উন্নয়নের একটি প্রধান জ্ঞানভান্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। Mission: স্বাস্থ্য, পুষ্টি, ভ্রমণ, পরিবার, ক্যারিয়ার, ফ্যাশন, খাদ্য, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনদক্ষতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত, গবেষণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করা, যা মানুষকে আরও সচেতন, সুস্থ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত করে।