কাফ মাসল শক্ত রাখলে হার্টও ভালো থাকবে
হার্ট ভালো রাখতে খাবারের দিকে নজর দেওয়া, তেল-চর্বি কম খাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটার মতো অভ্যাসের কথা আমরা সবাই জানি। তবে শরীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের দিকেও নজর রাখা দরকার—পায়ের কাফ মাসল বা পেছনের পেশি। রক্ত চলাচলে সাহায্য করার কারণে এই পেশিকে অনেক সময় ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ বলা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এটি আক্ষরিক অর্থে দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড নয়।
কাফ মাসলকে ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ বলা হয় কেন?
পায়ের নিচের অংশের পেছনে থাকা কাফ মাসলের প্রধান দুটি পেশি হলো গ্যাস্ট্রোকনেমিয়াস ও সোলিয়াস। আমরা হাঁটা, দৌড়ানো বা পায়ের পেশি সংকুচিত করার সময় এই পেশিগুলো সক্রিয় হয়। তখন পায়ের শিরায় থাকা রক্তকে ওপরের দিকে, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের দিকে যেতে সাহায্য করে।
হৃৎপিণ্ড যেমন সারা শরীরে রক্ত পাম্প করে, তেমনই পায়ের কাফ মাসল নিচের অংশ থেকে রক্তকে ওপরের দিকে ফিরে যেতে সাহায্য করে। এ কারণেই একে অনেক সময় ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ বলা হয়।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা কম হাঁটাচলার অভ্যাস থাকলে পায়ের পেশি খুব একটা সক্রিয় থাকে না। তাই নিয়মিত পায়ের পেশি সচল রাখা রক্ত চলাচলের জন্য উপকারী।
তবে কাফ মাসল শক্তিশালী হলেই হৃদরোগের ঝুঁকি থাকবে না—এমন ধারণা ঠিক নয়। হার্টের সুস্থতার জন্য খাবার, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, ওজন এবং সার্বিক শারীরিক সক্রিয়তার দিকেও নজর দিতে হবে।
হাঁটলে পায়ে ব্যথা হয়?
হাঁটতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর কাফ মাসলে ব্যথা বা টান ধরছে, কিন্তু কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিলে আবার ব্যথা কমে যাচ্ছে—এমন হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
পায়ের রক্তনালিতে রক্ত চলাচল কমে গেলেও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের ব্যথা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ পায়ের রক্তনালির সমস্যার সঙ্গে শরীরের অন্য রক্তনালির সমস্যারও সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে পায়ে ব্যথা হলেই যে হৃদরোগ হয়েছে, এমন নয়। পেশিতে টান, অতিরিক্ত হাঁটা বা অন্য শারীরিক কারণেও পায়ে ব্যথা হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
কাফ মাসল শক্ত করবেন যেভাবে
কাফ মাসল শক্ত রাখতে নিয়মিত কিছু সহজ ব্যায়াম করা যায়। এর জন্য জিমে যাওয়া বা কঠিন ব্যায়াম করতেই হবে—এমন নয়।
কাফ ওঠানামার ব্যায়াম
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুই পায়ের ওপর সমানভাবে ভর দিন। এবার ধীরে ধীরে গোড়ালি মাটি থেকে তুলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করুন। কয়েক সেকেন্ড পর আবার গোড়ালি নামিয়ে আনুন। এভাবে কয়েকবার করতে পারেন।
শুরুতে কমবার করে ধীরে ধীরে অভ্যাস বাড়ানো ভালো। ব্যায়ামের সময় ভারসাম্য রাখতে প্রয়োজনে দেয়াল বা শক্ত কোনো জায়গায় হাত রাখতে পারেন।
বসে বসে পায়ের ব্যায়াম
দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে কাজ করতে হলে মাঝেমধ্যে বসে বসেই কাফ মাসল সক্রিয় করা যায়। চেয়ারে সোজা হয়ে বসে পায়ের গোড়ালি মাটি থেকে ওপরে তুলুন এবং আবার নামিয়ে আনুন। কয়েকবার এভাবে করার পর কিছুক্ষণ বিরতি নিন।
একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকলে শুধু এই ব্যায়াম নয়, মাঝেমধ্যে উঠে কয়েক মিনিট হাঁটাও ভালো অভ্যাস।
নিয়মিত হাঁটুন
কাফ মাসল সক্রিয় রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো নিয়মিত হাঁটা। প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটার অভ্যাস করুন। হাঁটার সময় গতি এমন রাখুন, যাতে শরীর সচল থাকে কিন্তু অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
শারীরিক সক্ষমতা থাকলে হালকা দৌড় বা জগিংও করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করলে হঠাৎ বেশি সময় বা বেশি গতিতে শুরু না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা ভালো।
পায়ের পেশি শক্ত হলেই কি হৃদরোগের ঝুঁকি কমে?
কাফ মাসল শক্ত রাখার সঙ্গে ভালো শারীরিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও সক্রিয় জীবনযাপন রক্ত চলাচল এবং সার্বিক হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে শুধু কাফ মাসলের শক্তির ওপর ভিত্তি করে হৃদরোগের ঝুঁকি বিচার করা যায় না।
হার্ট ভালো রাখতে একসঙ্গে কয়েকটি অভ্যাস মেনে চলা জরুরি। যেমন—সুষম খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত লবণ ও তেল-চর্বি কমানো, ধূমপান এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা। পাশাপাশি রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রার দিকেও নজর রাখা দরকার।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
হাঁটার সময় নিয়মিত কাফ মাসলে ব্যথা হওয়া, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যাওয়া, পা অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা, অবশ বা দুর্বল মনে হওয়া কিংবা পায়ের ত্বকের রঙে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপানের অভ্যাস বা আগে থেকে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যা থাকলে এসব লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
কাফ মাসলকে ‘দ্বিতীয় হৃৎপিণ্ড’ বলা হলেও এটি আসলে একটি উপমা। তবে পায়ের এই পেশি রক্ত চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দীর্ঘ সময় বসে না থেকে নিয়মিত হাঁটা, সহজ ব্যায়াম করা এবং পায়ের পেশি সচল রাখা ভালো অভ্যাস।
তবে শুধু কাফ মাসল শক্ত করলেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে—এমন নয়। হার্ট ভালো রাখতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সামগ্রিকভাবে সক্রিয় জীবনযাপন। আর পায়ে বারবার ব্যথা বা রক্ত চলাচলের সমস্যার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
What's Your Reaction?