অতিরিক্ত ব্যায়ামে কমতে পারে প্রজননক্ষমতা, যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
সুস্থ থাকতে নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি। তবে শরীরের চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ব্যায়াম, অপর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের অভাব প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে শরীরে দীর্ঘদিন শক্তির ঘাটতি তৈরি হলে মাসিক অনিয়মিত হওয়া কিংবা ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে কিছু ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে শরীরের ব্যয় করা শক্তির তুলনায় পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টি গ্রহণ না করা। তবে ব্যায়াম করলেই প্রজননক্ষমতা কমে যায়, এমন নয়। ব্যায়ামের মাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে।
অতিরিক্ত ব্যায়ামে নারীদের কী সমস্যা হয়?
দীর্ঘদিন কঠোর ব্যায়াম করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার না খেলে শরীরে শক্তির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় মস্তিষ্কের হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করে।
এর ফলে মাসিক অনিয়মিত হওয়া, দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকা কিংবা ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত না হলে গর্ভধারণে অসুবিধা হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কখনো কখনো ‘ফাংশনাল হাইপোথ্যালামিক অ্যামেনোরিয়া’ বলা হয়। তবে এই রোগ নির্ণয়ের আগে অন্য সম্ভাব্য কারণগুলো পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও কি ঝুঁকি রয়েছে?
পুরুষদের প্রজননস্বাস্থ্যও শরীরের পুষ্টি, হরমোনের ভারসাম্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত পুষ্টি ও অতিরিক্ত শারীরিক চাপ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু বেশি ব্যায়াম করার কারণে পুরুষের প্রজননক্ষমতা কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পেশি বাড়ানোর জন্য অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের ব্যবহার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব হরমোনজাতীয় উপাদান ব্যবহার করলে পুরুষের স্বাভাবিক হরমোন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়া, শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস এবং প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কতটুকু ব্যায়াম করা উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট তীব্র মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা, বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যারা নিয়মিত কঠোর ব্যায়াম করেন, তাদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা বিশেষভাবে জরুরি।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
অতিরিক্ত ব্যায়াম ও অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন—
◑মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা।
◑দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও দুর্বলতা।
◑ব্যায়ামের পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বেশি সময় লাগা।
◑আগের তুলনায় ব্যায়ামের সক্ষমতা কমে যাওয়া।
◑বারবার আঘাত পাওয়া বা হাড়ে চাপজনিত চিড় দেখা দেওয়া।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে প্রজননক্ষমতার সমস্যা হয়েছে, তা নয়। অন্য স্বাস্থ্যগত কারণেও এমন হতে পারে।
প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে করণীয়
ব্যায়ামের পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত খাবার কমিয়ে দেওয়া কিংবা শরীরের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
মাসিক তিন মাস বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকলে, দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত হলে কিংবা গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসক হরমোনের পরীক্ষা ও অন্যান্য মূল্যায়নের মাধ্যমে সমস্যার কারণ নির্ধারণ করবেন।
ব্যায়াম সুস্থ থাকার অন্যতম উপায়, প্রজননক্ষমতা কমানোর কোনো স্বাভাবিক কারণ নয়। তবে অতিরিক্ত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব ও বিশ্রামের ঘাটতি একসঙ্গে শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়াম করা, প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ এবং অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ থাকার সঠিক পথ।
What's Your Reaction?