এনজিওর আর্থিক সহায়তা নেওয়া কি জায়েজ
অভাবের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারও চিকিৎসার জন্য অর্থ দরকার, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো কঠিন, আবার কেউ দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়ে সহায়তার অপেক্ষায় থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিও মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
তবে প্রশ্ন হলো, কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া কি ইসলামে জায়েজ? সাহায্যদাতা মুসলমান না হলে সেই সহযোগিতা নেওয়া যাবে কি? আর সাহায্যের সঙ্গে কোনো শর্ত থাকলে তখন কী করণীয়?
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু কে সাহায্য করছে, তা দিয়ে বিচার করা হয় না। সাহায্য কেন দেওয়া হচ্ছে, কী কাজে ব্যবহার হবে এবং এর সঙ্গে কোনো অন্যায় বা ক্ষতিকর শর্ত আছে কি না,এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম মানুষের কল্যাণ ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করো না।’(সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ভালো ও কল্যাণকর কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করা উচিত। তবে সেই সহযোগিতা যেন অন্যায় বা ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
সাহায্যদাতা মুসলমান না হলে
কেউ মুসলমান নন বলেই তার কাছ থেকে বৈধ সাহায্য নেওয়া যাবে না,বিষয়টি এমন নয়। মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও বৈধ সামাজিক সম্পর্ক রাখার সুযোগ ইসলামে রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।(সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত ৮)
তাই শুধু সাহায্যদাতার ধর্মীয় পরিচয় দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সাহায্যের ধরন ও উদ্দেশ্যও দেখা প্রয়োজন।
এনজিওর সাহায্য নেওয়ার আগে যা দেখতে হবে
কোনো এনজিও যদি দরিদ্র মানুষের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান বা দুর্যোগে সহায়তার জন্য অর্থ দেয়, তাহলে সেই সহায়তার শর্তগুলো দেখা জরুরি।
যদি সাহায্যটি বৈধ কাজে দেওয়া হয় এবং এর বিনিময়ে কোনো হারাম কাজে যুক্ত হওয়ার শর্ত না থাকে, তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠানটি এনজিও,এই কারণে সাহায্য নেওয়াকে নিষিদ্ধ বলা যায় না।
তবে সাহায্যের সঙ্গে এমন কোনো শর্ত থাকলে, যা ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ বা নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তখন বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখতে হবে।
সাহায্যের আড়ালে ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে
ইসলাম ভালো কাজে সহযোগিতা করতে বলেছে, আবার অন্যায় কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। তাই কোনো সাহায্য গ্রহণের কারণে যদি ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে সাহায্যের বিনিময়ে কোনো অনৈতিক কাজে অংশ নেওয়া, ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের চাপ বা অন্যের ক্ষতির কারণ হওয়ার মতো শর্ত থাকলে সেই সহযোগিতা গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
প্রয়োজনের সময় সাহায্য নেওয়া কি অসম্মানের
অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়লে সাহায্য নিতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু বৈধ প্রয়োজনে সহযোগিতা নেওয়া অসম্মানের বিষয় নয়। বরং সামর্থ্যবান মানুষের দায়িত্ব হলো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
অন্যদিকে, যে ব্যক্তি সাহায্য নিচ্ছেন, তাকেও খেয়াল রাখতে হবে,অর্থটি যেন প্রয়োজনীয় ও বৈধ কাজে ব্যবহার করা হয়। অপচয় বা অন্যায় কাজে সেই অর্থ ব্যয় করা উচিত নয়।
শুধু কে দিচ্ছে, তা নয়
এনজিও বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো—সাহায্যটি কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কী শর্ত রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু ‘কে দিচ্ছে’ তা না দেখে ‘কেন দিচ্ছে, কী শর্তে দিচ্ছে এবং কোথায় ব্যবহার হবে’ এসব বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার।
সহযোগিতার মাধ্যমে সুন্দর সমাজ
একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্র পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করা।এসব মানবিক কাজ সমাজকে আরও শক্তিশালী করে।
তবে সেই সহযোগিতা হতে হবে স্বচ্ছ, বৈধ ও কল্যাণকর। ব্যক্তি হোক বা প্রতিষ্ঠান যে-ই সাহায্য করুক, তার সহায়তা যদি মানুষের প্রকৃত উপকারে আসে এবং এর সঙ্গে কোনো হারাম বা ক্ষতিকর শর্ত না থাকে, তাহলে সেই সহযোগিতার গুরুত্ব রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, এনজিও থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি শুধু প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। সাহায্যের উদ্দেশ্য, শর্ত, ব্যবহার ও সম্ভাব্য ফলাফলও বিবেচনা করা জরুরি। কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা জটিলতা থাকলে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।
What's Your Reaction?